উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৯৮ ভাগ কৃষক সরকারের ধান ক্রয়ের সুফল থেকে বঞ্চিত

0
32

শফিউল আযম ঃ
শস্যভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলে আমন ধানের দাম কম হওয়ায় ৫৬ লাখ কৃষক পরিবারের মুখে হাসি নেই। প্রতিমণ ধান উৎপাদনে তাদের খরচ পড়েছে প্রায় ৮৪০ টাকা। সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতিমন ৫০০-৬৫০ টাকা দরে। সরকারীভাবে খাদ্যগুদামে প্রতিমণ আমন ধান ক্রয় করা হচ্ছে এক হাজার ৪০ টাকা দরে। এ অঞ্চলের প্রায় ৯৮ ভাগ কৃষক সরকারের আমন ধান ক্রয়ের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক। সরকারের ক্রয় মূল্য হিসেবে কৃষকে প্রতিমণ ধানে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। আগাম দাদন নিয়ে ধান আবাদ করায় ঋণের টাকা পরিশোধ করতে তারা লোকসান দিয়েই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চালতি মওসুমে উত্তরাঞ্চলে বিনা-৭, বিনা-৮, বিনা-৪, বিনা-১০, ব্রি-ধান-৩২, ৩৩ বিআর-১১, ব্রি ধান-৪৯, লাল পাইজাম, কালা পাইজাম, স্বর্ণা, ধানী গোল্ড, স্বর্ণা নেপালী, লেমবু ও বিন্নি জাতের আমন ধানের আবাদ হয়েছিল। হেক্টর প্রতি ধানের ফলন চার দশমিক পাঁচ ও চালের ফলন দুই দশমিক সাত মেট্রিক টন ধরা হয়। সে হিসেবে প্রায় ১৮ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন ধরা হয় ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টন ধান ও ৫১ লাখ ২১ হাজার ৯০০ টন চাল। অনুকুল আবহাওয়ায় এ অঞ্চলে ব্রি ধান-৩৩, ব্রি-৩৯, বিনা ধান-৭ ও স্বর্ণা নেপালী ধানে বেশি ফলন হয়েছে। ব্রি ধান-৩৩, ৪৯ এবং‘ বিনা ধান-৭ এর বেশি ফলন হয়েছে। ব্রি ধান-৩৩, ৪৯ প্রতি হেক্টরে পাঁচ দশমিক পাঁচ টন ধান, তিন দশমিক সাত টন চাল এবং বিনা ধান-৭,৪,৯ ও স্বর্ণা নেপালী প্রতি হেক্টরে তিন দশমিক নয় টন চাল উৎপাদন হয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার বড়াট গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন জানিয়েছেন, আমন মওসুমে জমি প্রস্তÍুত করা থেকে শুরু করে শ্রমিক, ধান কাটা, পরিবহন মাড়াইসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিমন ধানে উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ৮৪০ টাকা। সেই ধান হাট-বাজারে প্রতিমন বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা। প্রতিমনে লোকসান হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। আগাম দাদন নিয়ে ধান আবাদ করায় টাকা পরিশোধের তাগাদায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক লোকসান দিয়েই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। যারা ধান বিক্রি না করে ধরে রেখেছেন তারা এখন হতাশায় ভূগছেন।
আতাইকুলা, তালগাছি, ডেমরা, বনগ্রাম, কাশিনাথপুর, সিঅ্যান্ডবি চতুরহাটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আমন ধানের বাজার দর কম হওয়ায় কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। এ অঞ্চলের হাটগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন ব্যাপারিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাট-বাজারে আমন ধান চিকন ও মোটা প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা প্রতিমন আমন ধানে লোকসান দিচ্ছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ফলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের দিন কাটছে কষ্টে। এদিকে ধানের দাম কম হওয়ায় এরকোন প্রভাব পড়ছে না পাইকারি চালের বাজারে। ফলে খুচরা বাজারে কমছে না চালের দাম।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি উপকরণসহ শ্রমের দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দাম বাড়ছে না। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষকই দরিদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি পর্যায়ের। তারা ঋণ করে ফসল উৎপাদন করেন। ফসল ওঠার সাথে সাথে বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হয়। প্রান্তিক ও বর্গা চাষিদের মওসুমি ফসল ওঠার সাথে সাথেই মহাজনের ঋণ শোধ করতে তাদের একযোগে ফসল বিক্রির জন্য বাজারে আনতে বাধ্য হন। এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রন করে এক শ্রেনীর ফড়িয়া, চালকাল মালিক ও মজুতদারেরা। কৃষকের গোলাশুন্য হলে কৃষিজ পণ্যের দাম বাড়ে। আর এ দামের সুবিধা পায় মজুতদার ও চালকল মালিক, বঞ্চিত হন কৃষক।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার আঙ্গারু গ্রামের কৃষক মজিদ আকন্দ বলেছেন, আমন ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা ধান হাটে নিয়ে পানির দারে বিক্রি করছেন। কৃষকের কাছে কোন বিকল্প না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই আবার মাঠে নামছেন ফসল উৎপাদনের জন্য। কৃষকের বোরো ও আমন ধানে লোকসান হওয়ায় তারা বোরো আবাদ কমিয়ে দিয়ে অন্য ফসল আবাদে ঝুঁকে পড়েছেন। বাড়াবিল গ্রামের কৃষক লোকমান মিয়া জানিয়েছেন, বাজারে ধানের কোন চাহিদা নেই। কৃষকের হাতে যখন ধান থাকবে না তখন দাম বাড়বে। সেই দাম বাড়া কৃষকের কোন উপকারেই আসবে না।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী নিজের জমিতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মজুরি শ্রমিক দিয়ে কৃষি জমিতে আমন ধান চাষ করেছিলেন। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে দেখেন তার লাভ তো দুরের কথা উৎপাদন খরচই উঠতে চায় না। মূলত ধানের বাজার নিয়ন্ত্রন করছে চালকল মালিক, মধ্যস্বত্তভোগী ও মজুতদারেরা। ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। এ বছর প্রতি কেজি আমন ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২১ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিমন ধান (৪০ কেজি) উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮৪০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে হাট-বাজারে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ দরে ধান বেচাকেনা হচ্ছে। ধান বিক্রি করে কৃষককে প্রতিমণে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সরকার উৎপাদনের তুলনায় ধান ক্রয় করছে কম। এতে ৯৮ ভাগ কৃষকই খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে পারছে না।
চাটমোহরের কৃষক নিয়ামতউল্লাহ নিজের জমিতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক খাটিয়ে বোরো ও আমন ধান আবাদ করেছিলেন। বছর শেষে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে হিসাব করে দেখেন তার লোকসান হয়েছে। শুধু তিনিই নন, উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষকের অবস্থা একই রকম। কয়েক বছর ধরে কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ও কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষি অলাভজনক পেশায় পরিনত হয়েছে। এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে গ্রামীন অর্থনীতিতে। প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা অব্যাহত লোকসানে কৃষি পেশায় টিকতে না পেরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে মোট কৃষি পরিবারের সংখ্যা ৫৫ লাখ ৭৩ হাজা ৮৮টি। রাজশাহী বিভাগে ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৬৫টি এবং রংপুর বিভাগে ২৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৬টি। এর মধ্যে বর্গা চাষি পরিবার ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮৭টি, প্রান্তিক চাষি পরিবার ২০ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৬টি, ক্ষুদ্র চাষি পরিবার ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩২২টি, মাঝারি চাষি পরিবার ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬টি ও বড় চাষি পরিবার এক লাখ ৫২ হাজার ৫৭৫টি। বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরে বিভিন্ন স্তরের কৃষক পরিবারের পরিসংখ্যান থাকলেও বর্গচাষি পরিবারের কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে উত্তরাঞ্চলে বর্গাচাষি পরিবারের সংখ্যা আট লাখ ২৯ হাজার ৭৫৭টি। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দাম কম হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি।
উত্তরাঞ্চলের আমন ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে গ্রামীন অর্থনীতিতে। এ অঞ্চলের গ্রামীন অর্থনীতিতে চরম মন্দা ভাব বিরাজ করছে। এনজিও’র এক ঋণের জালে থেকে অন্য ঋণের জালে আটকে যাচ্ছেন কৃষক। ব্যাংকঋণ সহজলভ্য না হওয়ায় বেশির ভাগ কৃষক চড়া সুদে দাদন নিয়ে আসন্ন বোরো আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ এলাকার ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বর্গাচাষিরা কৃষি পেশা ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন অন্য পেশা।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তপাা উপ-পরিচালক আজাহার আলী বলেন, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার আমনের উৎপাদন অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক ভাল হয়েছে। সরকারী পর্যায়ে সারা দেশে আমন ধান সংগ্রহ (ক্রয়) চলছে। প্রতিমন ধানের দাম বেধে দেয়া হয়েছে ১০৪০ টাকা। কৃষি উপকরণ ব্যবসার সাথে জড়িত ফিরোজ আহম্মেদ জানিয়েছেন, আমন ধান উৎপাদনের চেয়ে সরকারের ক্রয় লক্ষ্যমাত্র অনেক কম হওয়ায় ধানের বাজার দর নিয়ন্ত্রন করছে মজুতদার, মহাজন, মিলার ও ফড়িয়ারা। তারা উৎপাদিত ধানের অধিকাংশই কিনে থাকেন। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here