উত্তরের চলনবিল মধু উৎপাদনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে

0
12

শফিউল আযম বেড়া সংবাদদাতা:উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল শুধু মাছেই নয়; এখন মধু উৎপাদনেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। মাঠে মাঠে এখন সরিষার হলুদ ফুলের সমারোহ। থোকা থোকা হলুদ ফুল আকৃষ্ট করছে মৌমাছিসহ প্রকৃতি প্রেমীদের। দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য দেখতে প্রকৃতিপ্রেমীরা সপরিবারে ভিড় করছেন মাঠে, অনেকেই ছবি তুলছেন। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে দিগন্ত বিস্তৃত সরিষার ক্ষেত। ভ্রাম্যমান মৌচাষিরা মধু আহরনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মধু উৎপাদন চলনবিল অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চল থেকে প্রায় এক হাজার ৫০০ টন মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৩৫ কোটি টাকা বলে ভ্রাম্যমান মৌচাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় চলতি রবি মওসুমে ৬৯ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আগাম ও নাবী জাতের সরষে চাষ হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে ছুটে চলা বনপাড়া-হাটিকুমরুল যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে মাঠের পর মাঠ দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর থোকা থোকা হলুদ ফুলের চাদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্তরেখায়। নয়নাভিরাম সেই সরষে ক্ষেতের আলে আলে এখন শুধুই সারিসারি মৌবাক্্র। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় সরষের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। সরষে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে দুই টন হিসেবে ৬৯ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার ১৫০ টন। বনপাড়া-হাটিকুমরুল যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে মাঠের পর মাঠ দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর থোকা থোকা হলুদ ফুলের চাদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্তরেখায়। চলতি মওসুমে সরষের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চলনবিল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কলমগ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের প্রামানিক জানান, দুই বিঘা (৬৬ শতাংশ) জমিতে সরষে চাষ করতে খরচ হয় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা ছয় থেকে সাত মন সরষে উৎপাদন হয়। প্রতি মন সরষের বাজার মূল্য দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। অন্যান্য ফসল আবাদ করে প্রতি বিঘায় যে পরিমান লাভ হয় তার চেয়ে ওই পরিমান জমিতে সরষে চাষ করে দ্বিগুণ লাভ করা যায়। এ অঞ্চলে সরষের আবাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে মওসুমি মৌচাষিদের তৎপরতা। সরষে যেমন দিচ্ছে তেল, সাথে দিচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এছাড়া সরষের ফুল ও পাতা ঝরে তৈরি হয় জৈবসার। ফলে কৃষকেরা এখন ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সরষে চাষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। পাবনার হান্ডিয়াল এলাকার কৃষক আলেক দেওয়ান জানন, তিনি পাঁচ একর জমিতে সরষে আবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। তিন বছর ধরে সরষে চাষ করে তিনি প্রতি মওসুমে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। চলতি মওসুমে আরো বেশি লাভের আশা করছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

ইউরোপিয়ান হাইব্রীড এপিস মেলিফেরা মৌমাছির মৌ মৌ গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি উড়ে গিয়ে সরিষা ফুলে বসছে। কিছুক্ষণ পর পর মধু নিয়ে উড়ে এসে মৌমাছির দল ফিরছে মৌচাকে। চলতি মওসুমে যদি আবহাওয়া অনুকুল থাকে তাহলে চলনবিল থেকে এক হাজার ৪৫০ থেকে এক হাজার ৫০০ টন মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ২৫০ টাকা হিসেবে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এমনটিই আশা করছেন মৌচাষিরা। প্রায় এক মাস আগে বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় সাত শতাধিক প্রশিক্ষিত মৌখামারি চলনবিলে অস্থায়ী আবাস গেড়েছেন। মৌচাষিরা সরষে ক্ষেতের আলে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার মৌবাক্স বসিয়েছেন। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সরষে ফুলের মধু আহরণ চলে। এ সময়ে একেকজন মৌচাষি গড়ে দেড় থেকে দুই টন মধু আহরণ করতে পারেন।

উত্তরাঞ্চল মৌচাষি সমিতির সভাপতি পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় দ্বিগুন মৌবাক্্র নিয়ে হাজির হয়েছেন মৌচাষিরা। চলনবিল শুধু মাছের বিলই নয়; এখন মধু উৎপাদনের বিল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। মধু উৎপাদনে চলনবিল এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রাকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহের ফলে শুধু মৌচাষিরাই লাভবান হচ্ছেন তাই নয়। মৌমাছির বিচরণে সঠিকভাবে সরষের ফুলে পরাগায়ন ঘটছে। তাতে সরষের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে গেছে অনেক। এতে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। শুধু তাই নয় পরিবেশবিদরা বলছেন, ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ায় উপকৃত হচ্ছে পরিবেশ। মৌমাছি শুধু মধুই সংগ্রহ করে না, ফসলের জন্য ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ মেরে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের সহায়তা করে থাকে।

মৌচাষিরা জানান, বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহের পরিমান প্রায় এক লাখ কেজি। মধু প্রতি কেজি ২৫০ অগ্রিম বিক্রি হচ্ছে মাঠ থেকে। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ভেজালমুক্ত মধুর গুণগত মান খুবই ভালো। এ জন্য ভারতের ডাবর কোম্পানী, ঢাকার প্রাণ, স্কয়ার, এপি, এসিআইসহ ব্যান্ড প্রসাধনী কোম্পানীর এজেন্টরা চলনবিলের মাঠ থেকে অপরিশোধিত মধু অগ্রিম কেনা শুরু করেছে। সুন্দরবনের মধুচাষিরা চলনবিলে মধু সংগ্রহ করতে এসেছেন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে এখানে মধু সংগ্রহ পুরোদমে শুরু হয়েছে।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল জলিল সরকার বলেন, অতীত কাল থেকে মধু বহু রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। মধু পরিপাকে সহায়তা করে, ক্ষুধা বাড়ায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, সর্দি, কাশি, জ্বর, হাপানি, হৃদরোগ, পুরনো আমাশয়, দাঁত, ত্বক, পেটের পীড়াসহ নানা জটিল রোগ নিরাময় করে থাকে। মধুতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও ভেষজ গুণ রয়েছে। মধুর উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ যা যকৃতে গ্রাইকোজেনের মজুত গড়ে তুলতে সাহায্য করে। মধুতে রয়েছে ফলশর্করা ৩৮.২ ভাগ, গ্লুকোজ ৩১.৩ ভাগ, মালটোস ৭.১ ভাগ, সুক্রোজ ১.৩ ভাগ, পানি ১৭.২ ভাগ, উচ্চ চিনি ১.৫ ভাগ, ছাই ০.২ ভাগ, খনিজ পদার্থ আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফেট, সোডিয়াম ক্লোরিন, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে ৩.২ ভাগ। এছাড়া মধু ভালো শক্তি প্রদায়ী খাদ্য।

সাতক্ষীড়া থেকে আসা সোলায়মান ও আলমগীর তাড়াশ-মহিষলুটি আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে জলিলনগর মাঠে ১২৫টি বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে তারা চলনবিল অঞ্চলে মধু আহরণ করছে। মাত্র কয়েক দিন হলো এখানে এসেছে। তাদের ধারনা গত বারের চেয়ে অনেক বেশি মধু সংগ্রহ হবে। গত বছর দুই টন মধু আহরণ করেছিলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন টনের বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন। মৌচাষিরা জানান, বছরের সাত মাস মধু পাওয়া যায়। সরষের পর লিচু, আম, ধনিয়া, তিলসহ বিভিন্ন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়।

চলনবিলের ‘পরিবর্তন’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠণ এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ আদিবাসীদের মৌচাষ প্রশিক্ষন দিয়ে আসছি। প্রশিক্ষন নিয়ে প্রশিক্ষিত আদিবাসী নারীরা মধু সংগ্রহ করছেন। পুংরুহালী-মুন্ডুমালা গ্রামের আদিবাসী নারী দীপালী বালা মাহতো বলেন, একটি রানী মৌমাছির সাথে প্রায় ৩০০ শ্রমিক মৌমাছি নিয়ে একটি কাঠের ফ্রেমের মৌবাক্্র করা হয়। চলতি মওসুমে তারাশে দীপালী বালা মাহতোর মতো ৩৫ জন আদিবাসী নারী মধু সংগ্রহ করছেন।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজাহার আলী বলেন, এবার মৌচাষিদের হিসবের চেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ হবে। কারণ, সরিষা মৌসুম ছাড়াও চলনবিলের গ্রামাঞ্চলের গাছে গাছে মৌমাছিরা মৌচাক বানাবে, সেখান থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমান মধু সংগৃহীত হবে। চলনবিলে এখন ভরা মধু আহরনের সময়। তার ভাষ্যমতে, এবার চলনবিলে কম করে হলেও ৩৫ কোটি টাকার মধু সংগ্রহ হবে। তিনি স্বীকার করেন, মধুর বাজার দর কমে যাওয়ায় মৌচাষিরা মধু আহরন করে লাভবান হতে পারছেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here