করোনার কারণে ৯০ ভাগ তাঁত কারখানা বন্ধ বেকার হয়েছে পড়েছে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক

0
67

শফিউল আযম ঃ
মহামানি করোনাভাইরাসের কারণে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও টাংগাইলের তাঁতে তৈরি শাড়ি ও লুঙ্গি ভারতে রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। সরচেয়ে বড় মওসুম বাংলা নববর্ষ আর ঈদ-উল-ফিতরের বাজার হারিয়ে এবং উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন তাঁতিরা। মূলধনের অভাবে এ অঞ্চলের প্রায় ৯০ ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ হারিয়ে প্রায় ১০ লাখ তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। উৎপাদনের পাশাপাশি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি তাঁত কারখানা মালিকরা এখন বিপর্যস্ত। ঈদ-উল-আযহার বাজার নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা কবে কাটবে তার কোন ধারণা নেই। যে কারণে এই শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক ও মালিকদের মাঝে দিন দিন শঙ্কা বাড়ছে।
দেশের তাঁত সমৃদ্ধ পাবনার ঈশ্বরদী, সুজানগর, সাঁথিয়া, পাবনা সদর, বেড়া পেঁচাকোলা, রাকশা, বাটিয়াখড়া, সান্যালপাড়া, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, বালসাবাড়ী, শাহাজাদপুরের দ¦াড়িয়াপুর, খঞ্জনদিয়ার, রামবাড়ি, পুকুরপাড়, মনিরামপুর, প্রাণনাথপুর, শক্তিপুর, ঘাটপাড়া, রূপপুর, উড়িয়ারচর, নগরডালা, ডায়া, হামলাকোলা, জুগ্নিদহ, এনায়েতপুর, বেতিল, বেলকুচি, খুকনী, উল্লাপাড়া টাংগাইল জেলার পাথরাইল, চন্ডি, নলসুধা, চিনাখোলা, দেওজান, নলুয়া, হিঙ্গানগর, এলাসিন, বাতুলি, বাজিদপুর, বল্লা, রামপুরের তাঁত পল্লী জুড়ে এখন সুনশান নিরবতা।
বিকেএমই-এর সাবেক পরিচালক ও এনায়েতপুরের গোপালপুর গ্রামের হাই টেক্সটাইল ইন্ডাষ্ট্রিজের সত্বাধিকারী আলহাজ শেখ আবদুস ছালাম জানিয়েছেন, আমার ফ্যক্টোরীতে ৪৫টি পাওয়ারলুম ও ৫০টি হস্তচালিত চিত্তরঞ্জন তাঁত রয়েছে। করোনা ঝুঁকির আগ মুর্হুত পর্যন্ত সবগুলো তাঁতই চালু ছিল। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রায় তিন আগে থেকে সারা দেশের তাঁত কারখানা মালিকরা বিশেষ ডিজাইনের শাড়ী, লুঙ্গি, থ্রিপিস ও গামছা তৈরি করে থাকেন। ক্ষুদ্র থেকে বড় বড় বিপণি বিতানের মালিকরা বৈশাখী কাপড় কিনে মজুত করেন। উল্লেখ্যযোগ্য পরিমান বৈশাখী কাপড় ভারতে রফতানি হতো। করোনার কারণে এবার বৈশাখী কাপড় বিক্রি হয়নি। তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যসায়ীদের গুদামে প্রায় এক হাজা ৫০০ কোটি টাকার কাপড় মজুত পড়ে আছে। আগামী নববর্ষ ছাড়া বিশেষ ডিজাইনের এই কাপড় বিক্রি হবে না। ঈদ-উল-ফিতরের বাজারও তাঁতিরা হারিয়েছে। মূলধনের অভাবে দেশের তাঁত কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিক ও শ্রমিকর বেকার হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পাবনার বেড়ার পাইকারী কাপড় ব্যবসায়ী শহিদ আলী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস বিস্তারের আগে ভারতের শান্তিপুর, সুমুদ্রগর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, গঙ্গারামপুর, কলকাতা ও হওড়ার মিতুল দত্ত, সুব্রত সাহা, অজিত দত্ত, জগন্নথ হলদারসহ শতাধিক ব্যবসায়ী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরহাট, এনায়েতপুর ও টাংগাইলের করটিয়াহাট থেকে প্রতি সপ্তাহে ছয় ট্রাক (প্রতি ট্রাকে ১৫ হাজার পিস) প্রায় ৯০ হাজার পিস শাড়ী ও লুঙ্গি কিনে নিয়ে যেতেন। পরে তারা সেই শাড়ী ও লুঙ্গি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিন ২৪ পরগনা, মেদিনীপুর, হুগলী, বর্ধমান, নদীয়, মূর্শীদাবাদ, মালদহ, জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিন দিনাজপুর, কুচবিহার, হওড়া ও হুগলীর নামিদামি শপিংমল, বিপনী বিতান ও ছোট-বড় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে থাকে। করোনাভাইরাসের কারণে গত চার মাস ধরে ভারতে শাড়ী ও লুঙ্গি রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ব্যবসায়ী এবং কারখানার মালিকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
অথচ প্রতি বছর ঈদ উল আযহাকে ঘিরে বাহারি নানা ডিজাইনের কাপড় বুনতে নির্ঘুম সময় পার করত শ্রমিকরা। তাঁতের চিরচেনা খট খট শব্দের মাঝে তাঁতিদেও উচ্চকিত কন্ঠের গানে মুখরিত থাকতো পুরো তাঁত পল্লী। কিন্তু এবছর করোনাভাইরাসের প্রকোপে লকডাঊনের কারণে হাত ছাড়া হয়ে গেছে নববর্ষ ও ঈদ-উল-ফিতরের বাজার। মজুত হয়ে আছে শত শত কোটি টাকার কাপড়। ঈদ-ঊল-আযহার বাজার নিয়েও শঙ্কায় তাঁত শ্রমিক ও মালিকেরা।
উল্লাপাড়া উপজেলার বালসাবাড়ী গ্রামের তাঁত শ্রমিক আবু তাহের জানালেন, গত বছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তৈরি বিশেষ ডিজাইনের কাপড় বুণনের বিল দিয়ে তিনি এনজিওর ঋণ শোধ করেছিলেন। ঈদ মওসুমের কাজের বিল দিয়ে ঈদের কেনাকাটা আর বাড়তি খরচ করেছিলেন। কিন্তু এবছর ঈদ-ঊল-আযহায় ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড় তো দুরের কথা পেটের খিদে কিভাবে মিটাবেন তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। বেলকুচির তাঁত শ্রমিক আবুল মন্ডল বললেন, প্রায় ১১ বছর ধরে আমি তামাই বাজারে তাঁত শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি। সারা বছর ধরে আমার মতো তাঁত শ্রমিকরা বাংলা নববর্ষ আর ঈদ মওসুমের অপেক্ষায় থাকি। এ সময়ের অতিরিক্ত আয় দিয়েই আমরা আমাদের সংসারের বাড়তি খরচ মেটাই। আর বছরের বাকি সময়ের বিল আমরা শুধু পেট চালাই। কিন্তু এ বছর সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে এই করোনাভাইরাস।
অপরদিকে শ্রমিকদের পাশাপাশি তাঁত করখানার মালিকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। শাহজাদপুর উপজেলার পুকুরপাড় গ্রামের ক্ষুদ্র তাঁত কারখানার মালিক সামসুল আলম জানালেন, অনেক শ্রমিকই এখন সংসার চালাতে আমাদের কাছে দারস্থ হচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সামর্থ্য সীমিত হয়ে পড়েছে। মজুত কাপড় বিক্রি করতে পারছি না। ফলে তাঁত কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদ-উল-আযহার বাজার নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা কবে কাটবে তার কোন ধারণা নেই। যে কারণে এই শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক ও মালিকদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বাড়ছে।
সিরাজগঞ্জ পাওয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও টাংগাইল জেলায় রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক তাঁত শ্রমিক। এদের মধ্যে তিন লাখ পাওয়ার লুম এবং চার লাখ রয়েছে হস্তচালিত তাঁত শ্রমিক। এ ছাড়া সুবুনন প্রক্রিয়াজাত রং এবং ডিজাইনের সাথে জড়িত রয়েছে আরো প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। সিরাজগঞ্জ পাওয়ার অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বদিউজ্জামান জানিয়েছেন, তাঁত কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় তাঁতী এবং তাঁত শিল্প হুমকীর মুখে পড়েছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here