করোনা ও বণ্যার কারণে গরু-মহিষের দাম ও চাহিদা কমেছে

0
69

শফিউল আযম ঃ
মহামারী করোনা ভাইরাসের ক্ষতির প্রকোপ কাটতে না কাটতে দেশ জুড়ে বণ্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে করে দেশের অর্খনীতির উপর বিরুপ প্রভাব পড়েছে। সেই ধাক্কা পড়েছে পশুরহাটগুলোতে। এদিকে কোরবানির বাজার ধারার জন্য দেশের গো-খামারি, চাষি ও মওসুমি ব্যবসায়ীরা গবাদিপশু লালন-পালন করেছেন। হাট-বাজারে গবাদিপশুর চাহিদা ও দাম কম হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় খামারি, চাষি ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া এ বছর দেশে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ পশু অবিক্রিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভলপমেন্ট ফোরামের (বিডিডিএফ) সাধারন সম্পাদক জানিয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুয়ায়ী, এবার ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য এক কোটি ১০ লাখ গবাদিপশু দরকার হবে। কিন্তÍ সারা দেশের খামারগুলো ও চাষিদের বাড়িতে এক কোটি ১৯ লাখ গরু-মহিষ, ছাগল, ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই চাহিদার তুলনায় নয় লাখ গবাদিপশু বেশি। এছাড়া গত বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল এক কোটি ১৮ লাখ পশু। এরমধ্যে এক কোটি ছয় লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। সেই হিসেবে গত বছরের ১২ লাখ পশু অবিক্রিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এবার কোরবানির পশুর যে চাহিদা নিরুপণ করেছে, তা থেকে ২০ শতাংশ গবাদিপশু বিক্রি কম হবে। কারণ, ক্রেতাদের হাতে টাকা নেই।
গবাদিপশু বিশেষ করে গরু ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বেড়ার সিঅ্যান্ডবি চতুরহাট, নাকালিয়া, নগরবাড়িহাট, সাঁথিয়ার ধুলাউড়িহাট, আতাইকুলার পুস্পপাড়াহাট, দাসুড়িয়াহাট, চাটমোহরের অমৃতকুন্ডা, শাহজাদপুরের তালগাছি, উল্লাপাড়ার গোয়ালিয়াহাট, গ্যাসেরহাট, তারাশ চলনবিল এলাকার নওগাঁহাট, চৌহালীর এনায়েতপুরহাট ও বেলকুচির সমেশপুর পশুরহাটে দেশি জাতের প্রচুর গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আমদানী হচ্ছে। ক্রেতার জন্য হাপিত্যেস করছেন বিক্রেতারা। গত বছরের তুলনায় এবার গবাদিপশু বিক্রি হচ্ছে খুবই কম।
এ অঞ্চলের গোখামারী ও চাষিরা এবার কোরবানীর ঈদে দেশের বিভিন্ন জেলার পশুরহাটে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু-মহিষ সরবরাহ করার জন্য প্রস্তÍত করেছেন। করোনা ভাইরাস ও বণ্যার কারণে হাট-বাজারে গবাদিপশু বিক্রি হচ্ছে খুব কম। এবার গরুর ব্যাপারিরা খামারী ও চাষিদের বাড়ী থেকে গরু কিনছেন না। হাটে দেশি গরু প্রচুর আমদানী হচ্ছে। ছোট সাইজের গরু কম বেশি বিক্রি হচ্ছে। দেশি ক্রস পাবনা ব্রিডসহ বিদেশি হাইব্রিড জাতের গরু প্রচুর আমদানি হলেও ক্রেতার অভাবে বিক্রি হচ্ছে না। গত বছর যে গরু দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেই মানের গরু ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে ন্।া তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ছাগল।
গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুরহাট সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাটে গবাদিপশুতে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। দুর-দুরান্ত থেকে গরু চাষি ও খামারীরা শত শত ট্রাক, নসিমন, করিমন ও নৌকায় করে হাজার হাজার গরু নিয়ে এসেছে। হাটের মধ্যে জায়গা না হওয়ায় বাঁধের উভয় পাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী পশুরহাট বসেছে। ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া আমদানী হয়েছে। কোরবানির এ সময়ে ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট, নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যাপারিরা এসে পাবনা-সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাটে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ক্রয় করতেন। সেলন্দা গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলাম তার খামারের সবচেয়ে বড় ষাঁড় গরুটি বিক্রি করতে হাটে নিয়ে এসেছেন। সাইফুল বলেন, দাম হাঁকিয়েছি তিন লাখ টাকা। কিন্তু এখন দেখছি ক্রেতা নেই। ব্যাপারি নেই। স্থানীয় কিছু ক্রেতা ও ব্যাপারি দাম বলছে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। গরুর দাম একেবারেই নেই। ব্যাপারি ও ক্রেতা না থাকায় গরুর দাম কম বলে জানালেন বিক্রেতারা।
খামারি ও মওসুমী ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাটে প্রচুর গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আছে কিন্তু ক্রেতা নেই বললেই চলে। এবার পাবনা-সিরাজগঞ্জের হাটগুলোতে ৪০ হাজার টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা দামের গরু উঠেছে। বেড়া চতুরহাটে গরু বিক্রি করতে এসেছেন সোনাতলা গ্রামের কৃষক করিম মুন্সি। তিনি বললেন, তিনটি গরু বিক্রি করতে হাটে তুলেছিলাম। দাম চাচ্ছি পৌণে চার লাখ টাকা। অথচ ব্যাপারিরা এই তিনটি গরুর প্রতিটির দাম বলছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পেরে গরু তিনটি বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
বেড়া উপজেলার পায়না গ্রামের আসাদুল্লা নামের গরু ব্যাবসায়ী বললেন, এসময় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় ব্যাপারির পদচারনা থাকত হাটগুলোয়। তারা ট্রাক ভর্তি গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া নিয়ে যেত। এবার করোনা ভাইরাসের কারণে দুর-দুরান্ত থেকে ব্যাপারিরা আসছে না। গরু বিক্রি করতে না পারায় সংসার চালানো নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। এদিকে হাটগুলোয় সামাজিক দুরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। কয়েকটি হাটের ইজারাদার বলেছেন, সামাজিক দুরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে মাইকিং করা হচ্ছে। হাটে মাস্ক ব্যবহার করতে ক্রেতা-বিক্রেতাকে অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু কেই কথা শুনছে না। হাটগুলো থেকেই করোনাভাইরাসের সংক্রমন বেড়ে যেতে পারে বলে সচেতন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কয়েকজন খামারি জানিয়েছেন, কোরবানির ঈদে দেশি ও শংকর জাতের গরু ভালো দামে আশা ছিল তাদের। কিন্তু করোনা ও বণ্যা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে গোটা চিত্র। এতে কাপাল পুড়েছে খামারিদের। লাভের আশা বাদ দিয়ে খরচ তোলা নিয়েই শংশয়ে রয়েছে তারা। উত্তরাঞ্চলের কোরবানির বড় পশুর হাট বসে পাবনার বেড়া উপজেলার সিঅ্যান্ডবিতে। রীতিমতো দেশি গরুর দখলে রয়েছে হাটটি। তবে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যাপারি ও ক্রেতা না আসায় গরু-মহিষের চাহিদা ও দাম দুটোই কমেছে। করোনা এবং বণ্যার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিন্মমধ্যবিত্তসহ অধিকাংশ মানুষই আর্থিক সঙ্কটে স্বল্প বাজেটে ছাগল কোরবানি দিতে চাচ্ছেন। এবার হাটে গরুর থেকে ছাগল বিক্রি হচ্ছে বেশি। খামারিরা ভেবেছিলেন, এ বছর ভারতীয় গরু তেমন না আসায় ভাল দামে গরু বিক্রি করা যাবে। তবে সে আশা পুরণ হয়নি। বর্তমানে হাটে ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় গরু এবয় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকায় ছাগল পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ডেইরি ডেভলপমেন্ট ফোরামের (বিডিডিএফ) সাধারন সম্পাদক ইমরান হোসেন বেেলছেন, দেশের ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ মানুষ এবার কোরবানি দিতে পারবে না। করোনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের কারণে দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা খারাপ। এদিকে গত চার মাসে করোনা পরিস্থিতির কারণে নিয়মিত বাজারে অর্ধেকের কম গবাদিপশু বিক্রি হয়েছে। এগুলোর পরিমান প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ। সবমিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে যে গবাদিপশু আছে সেখান থেকেই প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ পশু এবার অবিক্রিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here