কিংবদন্তির বিশাল ভান্ডার চলনবিল হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র

0
71

শফিউল আযম ঃ
বহুল প্রচলিত প্রবাদে আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’। প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খালের সমন্বয়ে গঠিত উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল- যার নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে। অথৈ পানিতে উত্থালপাতাল ঢেউয়ের কথা ভেবে। তবে চলনবিলের এ রুপ বর্ষার। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতি ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রুপে দেখা যায় চলনবিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুকে নিয়ে ভয়ংকর রুপ ধারন করে এ বিল, শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছোপ ছোপ সবুজ রঙের খেলা। হেমন্তে পাঁকা ধান আর সোঁদা মাটির গন্ধে মÑম করে চারদিক। শীতে হলুদ আর সবুজের সমারোহ এবং গ্রীষ্মে চলনবিলের রুক্ষ রুপ। প্রতি ঋতুতে চলনবিলের মূল আকর্শন নৌভ্রমন।
‘ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ নামক বই থেকে জানা যায়, নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই; সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল শেরপুর মিলেই ছিল বিশাল আযতনের চলনবিল। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ এই তিন অংশে বিভক্ত হয় চলনবিল। বর্তমান চলনবিলে নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ফরিদপুর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন, আটটি পৌরসভা ও এক হাজার ৬০০টি গ্রাম রয়েছে। পুরো অঞ্চলের লোকসংখ্যা ২০ লাখের বেশি।
বর্ষাকাল শুরু থেকে শরৎকালের শেষভাগ এ সময় পর্যন্ত বিশাল চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নয়নাভিরাম লাল,বেগুণী ও সাদা শাপলা। বর্ষার শুরুতে শাপলার জন্ম হলেও হেমন্তের শিশির ভেজা রোদমাখা সকালে বিলে চোখ পড়লে রং-বেরঙের শাপলার বাহারী রুপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয় কোন এক সাজানো ফুল বাগানের মধ্যে শ্রষ্টার শ্রেষ্ট জীব হিসেবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি। বিলে শাপলার নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এছাড়া দেখা মিলবে হরেক রকমের পাখির। রঙিন মাছরাঙার মাছ শিকার তো আছেই। জলে পানকৌড়িদের ডুবসাঁতার খেলা। ধবল বক, শালিক, ডাহুক, ফিঙে, দোয়েল তো আছেই।
দেশের উত্তর জনপদের চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট তেমনি এর কিংবদন্তির ভান্ডারও বিশাল। চলনবিল জনপদের মানুষের মুখে মুখে কত যে উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুরূহ। চলনবিলে দেখতে পাবেন, দেশের বড় গ্রামগুলোর অন্যতম কলম গ্রাম। চাটমোহরে জগৎশেঠের কুঠির, বুড়াপীরের দরগা; সিংড়ার হযরত ঘাসি দেওয়ান (রহঃ) এর মাজার শরীফ; ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর জমিদারবাড়ী; সিরাজগঞ্জের তাড়াশের কাছে পিঠে বিনসারা গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা মিলবে কিংবদন্তি বেহুলা সুন্দরীর বাবা বাছো বানিয়া ওরফে সায় সওদাগরের বসতভিটা ‘জিয়ন কূপ’। এছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুরে খুবজিপুর গ্রামে দেখা যাবে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী যাদুঘর। এখানে পাবেন চলনবিলের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় জিনিসপত্র। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উত্তর জনপদের চলনবিল হতে পারে দেশের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুরে অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা মরহুম অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের হাতে গড়া চলনবিল জাদুঘর এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। জাদুঘরে আছে সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কুরআন শরীফ। গাছের ছালে বাংলায় লেখা প্রাচীন পুঁথিসহ অসংখ্য সামগ্রী। প্রায় ৩৫০ বছর আগে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা ঘাসী-ই-দেওয়ানের তিশিখালীর মাজার। এখানে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
এখানে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমানের মাজার। রায় বাহাদুরের বাড়ির ধ্বংসস্তুপ। দেশের বৃহত্তম গোবিন্দ মন্দির, কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমাম বাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদার বাড়ি। হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির। রায়গঞ্জের জয়সাগর মৎস্য খামার। চাটমোহরের হরিপুরে লেখক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়াড়ীতে লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বাড়িসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান বুকে ধারণ করে আছে চলনবিল।
চলনবিলের জনপদে অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, মাজার জলা রয়েছে আর সেগুলো ঘিরে রয়েছে নানা ইতিকথা, বিশ্বাস। বিলপাড়ের তারাশ উপজেলার নবগ্রামে নওগাঁ শাহি মসজিদ (মামার মসজিদ) ও ভাগ্নের মসজিদ নামে দুটি মসজিদ রয়েছে। মামার মসজিদটির পাশেই হজরত শাহ শরিফ জিন্দানির (র.) মাজার অবস্থিত। অনেকেই বলেন, মসজিদটি তিনিই নির্মান করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশে ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। রাজা ভানসিংহের সময় তার আগমন হয় বলে জানা যায়।
রাজা ভানসিংহের পরিষদবর্গ ও তার ঠাকুরেরা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় তিনি তার খিড়কি পুকুরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন বলে কথিত আছে। এখনো ভানসিংহের খিড়কি পুকুর রয়েছে। মামার মসজিদের পাশে ভাগ্নের মসজিদ নিয়ে নানা উপকথা শোনা যায়। কোন এক ভাগ্নে মামার সাথে পাল্লা দিয়ে এক রাতে নাকি মসজিদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাতের মধ্যে ছাদ দেয়া সম্ভব হয়নি, তাই সেটি ছাদবিহীন অবস্থায় ছিল। কেউ বলে, সেই ভাগ্নে ওই রাতেই মারা যাওয়ায় মসজিদটির নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকে।
বিলপাড়ের চাটমোহরের হান্ডিয়ালে শেঠের বাঙ্গালা ও শেঠের কুঠি মীরজাফরের সহচর জগৎশেঠের বিশ্রামাগার ছিল বলে লোকে এগুলোকে আজো ঘৃণার চোখে দেখে। হান্ডিয়ালে রয়েছে বুড়াপীরের দরগা। শোনা যায়, ১২৯২ বাংলা সনে গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারি সার্ভেয়ার বুড়াপীরের নিস্কন্টক জমি বাজেযাপ্ত করতে চাওয়ায় তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়াপীরের দরগায় গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আরোগ্য লাভ করেন।
চাটমোহরের সমাজ গ্রামের সমাজ মসজিদ নির্মান নিয়ে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। শেরশাহর ছেলে সলিম মসজিদটি নির্মান করেন বলে শোনা যায়। সলিমের জন্মের আগেই তার মাকে শেরশাহ ভুল বুঝে দিল্লি চলে যান। পরে পুত্র সলিমকে স্বীকৃতি দেন এবং তাকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। লোকজন আজো বিশ্বাস করেন, হজরত আশরাফ জিন্দানি (র.)-এর দোয়ায় শেরশাহের ভুল ভাঙে।
বিলপাড়ের সিরাজগঞ্জ জেলার নিমগাছিতে ফকির দলের আস্তানা ছিল। শোনা যায়, বিদ্রোহী ফকিরদল মুক্তাগাছার মহারাজার পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর আচার্যকে ময়মনসিংহ থেকে বন্দি করে নিমগাছিতে আটক রেখেছিল। নিমগাছির হাটখোলার পশ্চিমে ভোলা দেওয়ান নামে এক কামেলের মাজার রয়েছে। মাজারের পাশে একটি মসজিদ আছে। মাজারের ওপরে একটি বটগাছে সারা বছর মৌচাক থাকতো বলে হিন্দুরা কুসংস্কারচ্ছন্ন হয়ে মাজারে তেল-সিঁদুর দিত।
চলনবিলের কোহিত ডাকাতের কথা মানুষ এখনো বলে। কার সাধ্যি কোহিতকে আটকে রাখে। একবার নাকি পুলিশ ধরেছিল তাকে। দড়ি দিয়ে নয়, ডান্ডা বেড়ি দিয়ে বেঁধেছিল কোহিতকে। নৌকায় করে নেয়ার সময় কোহিত শুধু একটি ডুব দিতে চেয়েছিল। ডুব দেয়ার পর সে অদৃশ্য হয়ে যায়। পুলিশের হাতে পড়ে থাকল শুধু শিকল আর ডান্ড।
বেহুলা-লখিন্দরের উপকথা শুনে কে না মোহিত হয়। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগর মনসা দেবীকে মানত না, তাই নিয়ে কত কান্ড। সেই চাঁদ সওদাগরের সময় চাঁদের বাজার লাগত চলনবিল পাড়ে। আজকের বস্তুল হাইস্কুলের ঠিক পাশের ভিটায়। বিনসাড়া গ্রামে রয়েছে বেহুলা-লখিন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পাশেই আছে বহুলার কুয়া (কুপ)। বেহুলা চাঁদের বাজারে যে নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করতো সেটি বেহুলার খাড়ি নামে পরিচিত। বেহুলার খাড়ি নামক এই জোলা এখনো রয়েছে। খাড়ির পাশে নৌকাসদৃশ ডিবি রয়েছে। গ্রামের লোক এখনো বিশ্বাস করে, ডিবির নিচে বেহুরার নৌকা রয়েছে।
নিমগাছি হাটের পশ্চিমে জয়সাগর নামে এক বিশাল দীঘি রয়েছে। এই দীঘি নিয়ে নানা উপকথা প্রচলিত। রাজা অচ্যুত সেন এক যুদ্ধে জয়লাভ করে বিজয়ের স্মৃতিস্বরুপ জয়সাগর খনন করেছিলেন। দীঘি ১২ বছর ধরে খনন করা পরও নাকি এ দীঘিতে পানি ওঠেনি। এক রাতে রাজাকে এক সাধু স্বপ্নে দেখায় তার ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পর বাসর রাতে সে দীঘিতে নেমে একমুঠো মাটি তুললে পানি উঠবে। রাজার ছেলে তা করায় দীঘি পানিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকুমারের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর রাজবধুও সেখানে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই রাজবধু নাকি অভিশাপ দিয়ে যায় কেই এর পানি ছুঁবে না। লোকে ভয়ে এর পানি ব্যবহার না করায় জঙ্গলে ভরে যায় দীঘি। দীঘির মাঝে বেল গাছ জন্মে। সেই বেলও ভয়ে কেউ ছুঁতো না। এখন সেখানে মাছের চাষ হচ্ছে।
চলনবিলপাড়ের নটমন্দির, তারাশ কপিলেম্বর মন্দির, মামা-ভাগ্নের মসজিদ, আনুখাঁর দীঘি, পাগলাপীর, বারুহাসের বাঙ্গালা, তিসিখালীর ঘাসি দেওয়ানের মাজার, চৌগ্রামের বুড়াপীরের মাজার, চাপিলার মসজিদ, পলশুরা পাটপাড়া মসজিদ, গুরুদাসপুর এলাকার নীলকুঠি নিয়ে কত উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুরূহ। তবে সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
দেশের যে কোন প্রান্ত থেকেই পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জে আসা সম্ভব। রেলপথ আরো সহজতর। চলনবিলে নৌভ্রমন করতে হলে সিংড়া উপজেলা থেকে রিক্সাযোগে সিংড়া পয়েন্ট এলাকায় আসতে হবে। এখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকায় সারাদিনের জন্য নৌকা রিজার্ভ করে সমগ্র চলনবিল ঘুরে দেখা সম্ভব। নৌকায় রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। সিংড়া উপজেলার বিলদহর বাজার থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে সাবগাড়ী, হরদমা, জগিন্দ্রনগর নদী দিয়ে চলনবিলে প্রবেশ করা যায়। বিলশা অংশে ভ্রমনে গুরুদাসপুর থেকে আসা সহজ হবে।
এছাড়া সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলা দিয়ে চলনবিলে প্রবেশ করা সম্ভব। সামগ্রীক বিবেচনায় চলনবিল বৃহৎ। এর পুরো অংশ একদিনে ঘুরে দেখা কষ্টসাধ্য। চলনবিলের সমগ্র অংশ ঘুরে দেখতে দর্শনীয় স্থানগুলো আগে চিহিৃত করে নিতে হবে। চলনবিলের অপরুপ দৃশ্যকে উপভোগ করতে বর্ষাকালকে বেছে নিতে হবে।
(ছবিসহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here