চরাঞ্চলের কৃষি ও গো-খামার পাল্টে দিতে পারে অর্থনীতির চিত্র

0
10

শফিউল আযম বেড়া সংবাদদাতা:পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা-যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন নদী ভাঙা মানুষ। এক সময় পদ্মা-যমুনা নদী ছিল তাদের দুঃখের কারণ। এখন সেই নদীর চরে বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে তারা অভাব-অনটন দুর করছেন। অক্লান্ত পরিশ্রমে অসম্ভাবকে সম্ভব করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন নদী ভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার। নদীর পেটে জেগে ওঠা বালুচরে ভাগ্য বদলের স্বপ্নে ফসল বুনে ঘরে তুলে লাভবান হচ্ছেন খেটে খাওয়া অসহায় মানুষ। পদ্মা-যমুনার বালু চরে এখন সবুজের সমারোহ। চরাঞ্চলের কৃষি ও গবাদিপশুর াখামার পাল্টে দিতে পারে দু’টি জেলার অর্থনীতির চিত্র।

এইতো কয়েক বছর আগে যেখানে ছিল বালুচর, সর্বনাশা পদ্মা-যমুনার ভাঙনে ঘর-বাড়ী হরিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক পরিবার। অভাব অনটন ছিল তাদের নিত্যদিনের সাথী। এখন তাদের ভাগ্য বদলে গেছে। বণ্যায় পদ্মা-যমুনার বালুচরে পলিমাটি জমে এখন উর্বর আবাদি জমিতে পরিনত হয়েছে। দীগন্ত বিস্তীর্ণ বালুচরে শোভা পাচ্ছ্ নানা রকম ফসলের সমারোহ। নদীর তলদেশ শুকিয়ে জেগে ওঠে বালুচর। দীর্ঘদিন পরিত্যাক্ত থাকা এসব বালুচরে ফসল ফলানো দুরের কথা, ঘাসও জন্মাাতো না। অথচ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেই দু’টি নদীর ছোট-বড় প্রায় ৬০টি চরে ফলছে গম, কাাউন, ভূট্রা, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, গাজর, মরিচ, হলুদ, শসা, সিম, কপি, কুমড়াসহ শীতকালীন নানা প্রকারের শাক-সবজি চাষ করে ফসল ঘরে তুলছেন কৃষকরা। চরের বেলে দো-আঁশ মাটিতে ডাল জাতীয় ফসল মাসকালাই, খেসারী, ছোলা প্রচুর পরিমানে আবাদ হচ্ছে।

এছাড়া চরে গড়ে উঠছে স্থায়ী জনবসতি। চরাঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের পাশাপাশি গবাদিপশুর ছোট ছোট খামার গড়ে উঠেছে। চরের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই ২-১টি করে গাভী রয়েছে। ঘোষেরা কৃষকদের বাড়ী বাড়ী ঘুরে দুধ সংগ্রহ করে বেসরকারী দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্র করছে। এতে চরের কৃষকদের উৎপাদিত দুধ নিয়ে ভাবতে হয় না। বিক্রির জন্য হাট-বাজারেও যেতে হয় না। চরাঞ্চলের কৃষি ও গোখামার পাল্টে দিতে পারে দু’টি জেলার অর্থনীতির চিত্র।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা-যমুনার পেটে জেগে ওঠা চরপেচাকোলা, চরআড়ালিয়া, গোসাইবাড়ি, কোদালিয়া, সাঁড়াশিয়া, চরসাফুলা, চরনাগদা, চরঢালা, চরকল্যানপুর, পূর্বশ্রীকন্ঠদিয়া, পদ্মারচর, চরযমুনা, বাইরচর, শ্রীপুর, খিদ্রদাশুরিয়া, মুরাদপুর, ঘোড়জান, মেঘাইরচর, খাসকাউলিয়া, মিনারদিয়াচর, ওমরপুরচর, পয়লারচর, বানতিয়ারচর, মীরকুটিয়ারচর, রস্তমেরচর, সোলজানারচর, দইকান্দিরচর, চরআগবাঙলাচর, শিমুলকান্দিচর, ওমরপুরচর, আগবাকসোয়া, পয়লারচর, কল্যানপুর বারোপাখিয়ারচর, ধীতপুর, কুশিরচর, ভুমোরিয়া, চাঁমতারা, শিংঘুলি, নয়াহাটাবরংগাইল, ভারদিঘুলিয়া, চরবলরামপুর, চরভাড়ারা, সাদিপুর, সুদিরাজপুর, আশুতোষপুর, কোমরপুর, বীরপুর, পীরপুর, চালাকপাড়া, হঠাতপাড়ারচরসহ প্রায় ৬০টি চরে গড়ে উঠছে জনবসতি ও গবাদিপশুর ছোট ছোট খামার।

শুস্ক মওসুমে পদ্মা-যমুনা নদীর ছোট-বড় অসংখ্য চরে গম, কাাউন, ভূট্রা, বাদাম, হলুদ মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, গাজর, মরিচ, হলুদ, শসা, সিম, কুমড়াসহ শীতকালীন নানা প্রকারের শাক-সবজি। চরের আকার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তা স্থায়ী চরে পরিনত হচ্ছে। জনবসতীহীন দূর্গোম চরে এখন বসেছে প্রাণের মেলা। চরে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেরই রয়েছে গরু-মহিষের ও ছাগলেরছোট ছোট খামার। গবাদি পশুর খামার করে পাল্টে যাচ্ছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি। গবাদি পশু লালন পালনে বিপুল সম্ভাবনাময় চরাঞ্চলের কুষিজীবিরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দ্রুত বদলে যাবে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান। অভাব ঘুচবে অভাবী চরবাসীর। উৎপাদন বাড়বে দুধ কিংবা দুগ্ধজাত সামগ্রীর।

এতে চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে।চৌহালীর স্থল ইউনিয়নের গোসাইবাড়ি চরের শুকুর বেপারী বলেন, চার বছর আগে আমার সংসারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। কর্মসংস্থান ছিল না। বাধ্য হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে যমুনা চরে এসে নতুন বসতি গড়ি। গরু পালন করে এখন সাবলম্বী হয়েছি। আল্লাহর রহমতে সংসারে কোন অভাব-অনটন নেই। বর্তমানে চারটি গরু নিয়ে একটি ছোট খামার গড়ে তুলেছি। খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের কোদালিয়ার ময়নাল সিকদার, উমারপুর চরের আবু ছাইদ ও কোরবান আলী জানিয়েছেন, চর এলাকায় খোলমেলা পরিবেশে গরু পালন করায় রোগ বালাই কম হয়। পলি মাটির আস্তরন ভেদ করে জেগে ওঠা কাঁচা ঘাস, বিচালি খাইয়ে তারা কম খরচে গবাদিপশু লালন পালন করছেন। এজন্য চরে অনেকেই গরু-ছাগলের ছোট ছোট খামার গড়ে তুলছেন।

বর্তমানে চরে বসতি স্থাপন করে বসবাস করছেন ভূমিহীন মানুষরা। বাড়ির আঙিনায় মাথা উঁচু করলেই দেখা যায় ফসলের ক্ষেত। চোখ ধাঁধানো বর্ণিল সবুজ ফসলের সরব উপস্থিতির কারণে অনেক কৃষক তাদের গবাদিপশু নিয়ে চরে উপস্থিত হয়েছেন। চরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে গো-খামার গড়ে উঠছে। গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় এই সমস্ত কৃষকরা তাদের গবাদিপশু নিয়ে চরে এসেছেন। পলি মাটির আস্তরন ভেদ করে জেগে ওঠা কাঁচা ঘাস, বিচালি খাইয়ে তারা গবাদিপশু লালন পালন করছেন। এক সময় পদ্মা-যমুনা নদীতে পানির প্রাচুর্যতা থাকলেও ক্রমশ তাতে ভাটা পড়েছে।

পদ্মা-যমুনা নদীর পেটে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। চরের বালিয়ারীগুলো ক্রমশ আবাদি জমিতে পরিনত হচ্ছে। আর এসব জমিতে এখন আবাদ হচ্ছে গম, কাাউন, ভূট্রা, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, কুমড়া, গাজর, শাক-সবজিসহ নানা প্রকারের অর্থকরী ফসল। একদিন পদ্মা-যমুনা তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল। এখন নদীর বুকে চর জেগে উঠায় তারা একে একে আবার জড়ো হয়েছেন এসব চরে। যেসব গ্রাম একদিন নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল পূনরায় সেই নামেই চরে নতুন করে গড়ে তুলছে বসতি। তবে বসতি গড়ে উঠলেও চরে বসবাসরত ছেলে-মেয়েরা শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তাদের লেখাপড়ার জন্য নেই কোন স্কুল-মাদ্রাসা।

নদীভাঙা অভাবী শত শত পরিবার নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরকে কাজে লাগিয়ে অভাব দুর করছেন। এই সকল পরিবারের নারীরা তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে শাররীক পরিশ্রম করে বিভিন্ন ফসল ফলাচ্ছেন। সেই ফসল বিক্রি করে সফলতা পাচ্ছেন। চলতি মওসুমের শুরুতে ফসল চাষ করে চাষিদের মুখে এখন সাফল্যের হাসির ঝলক। মিনারদিয়ার চরের কৃষক আতাউল জানালেন, বালুচরে ফসল ফলানো যাবে এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন বালুচরে ফসল আবাদ করে অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। প্রতি বছরই বাড়ছে চরের পরিধি। সেই সাথে বাড়ছে ফসলের ফলন। লাভের টাকা হাতে পেয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কৃষকরা।

পদ্মা-যমুনার চর থেকে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে প্রচুর গরু বিক্রি হয়। চরে গবাদিপশুর খামারিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। কারণ গরু পুষতে তাদের বেশি খরচ বহন করতে হয় না। চরের জমিতে রোপণ করা ধানের খড় ও নানান ফসল খেয়ে গরুগুলো বড় হচ্ছে। এ কারণেই প্রতিনিয়তই চরে গো-খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পদ্মা যমুনা নদীর সম্ভাবনাময় চরের কৃষি ও গো-খামার পাল্টে দিতে পারে চরাঞ্চলসহ জেলার অর্থনীতির চিত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here