চলনবিল নানা জাত-প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখরিত

0
26

শফিউল আযম ঃ
প্রাণঘাতি করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক পরিবর্তন এসেছে। আর প্রকৃতির হলুদ ও সবুজ রং ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সেই সঙ্গে চলনবিলে নানা জাত-প্রজাতির রং-বেরঙের পাখির কলকাকলি, খুনসুটি, ওড়াউড়ি ও পানির ভেতর ডুব দেয়া আর দলবেঁধে সাঁতার কাটার দৃশ্য দেখে তৃপ্ত হন পর্যটকরা। এবছর অন্যান্য বছরের মতো পাখির দেখা নেই। কমেছে পাখির সংখ্যা। তবে বেড়েছে পাখির প্রজাতি।
কালের বিবর্তণে বর্ষা মওসুমে চলনবিলের আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। শুষ্ক মওসুমে (মূল বিলটি) আয়তন কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক নয় থেকে ৩১ বর্গকিলোমিটার। বিল পাড়ের বাসিন্দাদের দেয়া তথ্য মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর পাখির সংখ্যা কমে এসেছে। যার জন্য দুটি কারণকে দায়ি করছেন তার। জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া এবং শীত কম থাকা। সেই সাথে চলনবিলে অবাধে চলছে পাখি শিকার। প্রতি রাতেই বিষটোপ এবং বিভিন্ন ধরনের জাল ও ফাঁদ ব্যবহার করে নতুন নতুন পদ্ধতিতে পাখি শিকার করছে চোরা শিকারিরা।
চলনবিল ঘুরে বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘এ বছর শীত বেশি পড়েনি, তার ওপর প্রাকৃতিক কারণে কমে গেছে জলজ উদ্ভিদ। পরিযায়ী পাখীদের বড় একটি অংশ পানিফল, হেলেঞ্চা, বল্লুয়া,চাল্লিয়া ইত্যাদিসহ শাপলাপাতাকে ঘিরে বসবাস করে। এসব জলজ উদ্ভিদ থেকে নানা ধরনের উদ্ভিদ এবং পোকা খেতে পছন্দ করে। কিন্তু প্রতি বছর বর্ষা মওসুমের পর জেগে ওঠা সমতল ভূমিতে ফসল আবাদে প্রচুর পরিমান রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রযোগ এবং কচুরিপানার কারণে পনির নিচে থাকা জলজ উদ্ভিদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে জলচর পাখিদের সংখ্যা কমে এসেছে। অন্যান্য বছর যেভাবে পাখির উপস্থিতি দেখা মিলত, এ বছর তা নেই। চলনবিলের বিশাল অংশ জলজ উদ্ভিদ শুন্য। জলজ উদ্ভিদ কমে গেছে অন্তত ৪০ শতাংশ। অন্যান্য বছর থেকে পাখির সংখ্যা কম হলেও এ বছর বেড়েছে পাখির প্রজাতি। গত বছর চলনবিলে ৩০ প্রজাতির পাখির দেখা মিললেও এ বছর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪২ প্রজাতির দেখা মিলেছে। যা নানা প্রজাতির পাখির জন্য চলনবিল আদর্শ জায়গা হিসেবে প্রমান করে।
পাখিপ্রেমী সালেহ উদ্দিন জানান, পাখিদের নিরাপদ অবস্থানের জন্য চলনবিলে জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে প্রতি বছর বাড়বে পরিযায়ী পাখির আগমন। চলনবিলের শাপলা শালুকসহ পর্যাপ্ত খাবার সংস্থান থাকায় এই বিলে প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। পরিযায়ী পাখি এদেশের পরিবেশের ওপর গৃরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাখিদের বিষ্ঠা চলনবিলের মাছের উৎকৃষ্ঠ খাবার। তিনি অভিযোগ করেন, চলনবিলে প্রতিদিন রাতের আধারে পাখি শিকার করছে চোরা শিকারিরা। যা ভোরের আলো ফোটার আগেই মুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট হাতে এবং স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। বিষটোপ দিয়ে পাখি হত্যা করা হচ্ছে। তিনি চলনবিলে বিষটোপ দিয়ে হত্যা করা পাখির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
বিশিষ্ট পাখিবিদ (অবঃ) অধ্যাপক ড. জাকির হোসাইন জানান, এবছর পাখির উপস্থিতি অন্যান্য বছর থেকে কম। তবে আমি ৪২ প্রজাতির পাখির দেখা পেয়েছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজ সরালি, বালিহাঁস, পাতি তিলি হাঁস, মরচে রং ভূতিহাঁস, গিরিহাঁস, পিয়ং হাঁস, গয়ার বা সাপপাখি, পাতিকুট, পাতি পানমুরগি, বেগুনি কামেল, পানকৌড়ি, কানিবক, ডাহুক, জলময়ুর, ছোট ডুবুরি, ধলাবক, বেগুনি বক, ধুপনি বক, মাছরাঙা, গোবক, লালফিদ্দা, বড়গুটি ঈগল, পুরের পানকাপাস, পালাসি কুরাঈগল, সঙ্খচিল, প্রায় ৫-৭ প্রজাতির ফুটকি, কালা লেজ জৌরালি, তিলা লালপা, বিল বাটান, গেওয়ালা বাটান, কালাপাখ ঠেঙি, লাল লতিকা টিটি, মেটেমাথা টিটি, রাঙাচ্যাগা ইত্যাদি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞান অনুষদ বিভাগের ডিন ও প্রাণী বিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু চলনবিলই নয়, রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মা নদীতে পাখির আনাগোনা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ বর্তমান সময়ে শব্দ ধূষণ, বায়ু দূষণ ও প্রকৃতিতে নিরাপত্তাবোধ থেকেই পাখির আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়া অন্যতম কারণ বলে তিনি জানিয়েছেন।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন ‘পাখি শিকারিরা বিভিন্ন কায়দায় পাখি ধরে নিয়ে ফেরি করে গ্রাম-গঞ্জে বিক্রি করছে। তাই এসব অতিথি পাখি আর চলনবিল নিরাপদ ভাবছে না। ফলে কমছে পাখির সংখ্যা। সেই সাথে নিয়ম না মেনে চলনবিলে করা হচ্ছে ফিশারি। যার কারণে উদ্ভিদ ও জলজ বৈচিত্র্য নেই। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে চলনবিলকে নিরাপদ রাখতে পারলে সারা বছর এখানে পাখি থাকবে। জলজ উদ্ভিদের ভেতর লুকিয়ে থেকে পরিযায়ী পাখিরা নিজেকে শক্রর হাত থেকে রক্ষা করে এবং খাবার সংগ্রহ করে। জলজ বনে জলময়ুরসহ অনেক প্রজাতির পাখি ডিম পাড়ে। তাই জলজ বন ও জলজ উদ্ভিদ না থাকলে পাখি আসবে না। এগুলোর দিকে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here