ছাদকৃষি, ১০ তলার ওপর যেন আবাদি ক্ষেত

0
36

শাইখ সিরাজ

১০ তলার ওপর যেন আবাদি ক্ষেত
উদ্যোক্তা জান্নাতুল মাসুদ কণার ছাদকৃষিতে লেখক
ধানমণ্ডির ১০ তলা ভবনের একটি ছাদে উঠে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম। পুরো ছাদ যেন এক আবাদি ক্ষেত। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকোলি, বেগুন, টমেটো, লাউসহ নানা রকম সবজির চাষ হচ্ছে সেখানে। ছাদটিতে জায়গা মাত্র সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট।

তবে পরিকল্পিতভাবে সাজানো-গোছানো বলে গাছপালা আর ফল-ফসলের কমতি নেই। ঠাঁই পেয়েছে কিছু ফুল আর ঔষধি গাছও।
এই মুগ্ধ করার মতো কৃষি আয়োজনটির উদ্যোক্তা জান্নাতুল মাসুদ কণা। তিনি ছাদকৃষি করছেন বছর দুই হলেও কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক বিবাহসূত্রে।

জান্নাতুলের স্বামী মেহেদী মাসুদ একজন কৃষিবিদ। তিনি কর্মসূত্রে সরকারের কৃষি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। এ লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় জান্নাতুল বললেন, গাছগাছালির সঙ্গে প্রেম তাঁর বাল্যকাল থেকেই। ফুল ভালোবাসতেন।

আর ফসল ভালোবাসতে শিখেছেন স্বামীর কাছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ড. মেদেহী মাসুদ ছাদকৃষি অনুষ্ঠানে গাছের ডাক্তার হিসেবে অনেক আয়োজনেই উপস্থিত ছিলেন। জান্নাতুলের ছাদকৃষির একটি ব্যতিক্রমধর্মী দিক ছিল ব্যাগিং পদ্ধতিতে আদা চাষ। মেহেদী মাসুদ জানালেন, জিও ব্যাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বলে পরিবেশবান্ধব। এটি তাপপ্রতিরোধী ও জলরোধী হওয়ায় ব্যবহারের জন্য টেকসইও বটে।

ব্যাগিং পদ্ধতিতে আদা চাষ করলে কন্দ পচা রোগ হয় না। যদি রোগ দেখাও যায় তখন গাছসহ বস্তা সরিয়ে ফেলা যায়। এতে কন্দ পচা রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। এ পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম।

যত দূর জানি, দেশে এখন আদার চাহিদা বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। আমাদের উৎপাদন এর মাত্র অর্ধেকের মতো—দুই থেকে আড়াই লাখ মেট্রিক টন। বাকি আদা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ সহজেই গ্রামে কিংবা শহরের বাড়িতেই আদা চাষ সম্ভব। চাষযোগ্য পতিত জমি বা বসতবাড়ির আশপাশে, ফলবাগান ও ভবনের ছাদে জিও ব্যাগে এর চাষ সম্ভব।

জান্নাতুল কণার ছাদকৃষি গড়ে উঠেছে একটি পরিকল্পিত কাঠামোর ওপর। তিনি বলছিলেন, শহর-নগরের বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে এখন ছাদকৃষি মাথায় রেখে কাঠামো গড়া উচিত। এতে ছাদটি যেমন সবুজ করে তোলা যায়, বাড়িও থাকে শীতল। আর সতেজ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও এটি বেশ ভূমিকা রাখে। পুষ্টিবিদরা বলেন, সতেজ খাবারে পুষ্টিমান বেশি থাকে।

জান্নাতুলের উৎপাদনকৌশল দেখেই বোঝা যায়, তিনি শতভাগ নিরাপদ ফসলের চর্চা করছেন। তাঁর সংসারের সবজির চাহিদার শতভাগই মিটছে ছাদের কৃষি থেকে। এর থেকে ভালো দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! এমন সৃজনশীল ও বৈচিত্র্যময় ছাদকৃষি সত্যিই অনুসরণীয়।

পরিবেশদূষণ, উষ্ণতাবৃদ্ধি, সর্বোপরি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে ছাদকৃষির প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর মাধ্যমে যে সবুজায়ন হচ্ছে তা বিষাক্ত কার্বন শুষে নিয়ে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে কিছুটা হলেও সহায়তা করছে। ছাদকৃষি সতেজ, বিষমুক্ত ফল-ফসল জুগিয়ে সংসারের ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করছে। ছাদকৃষির কাজে ব্যস্ত থাকলে শরীর ও মন উভয়ই ভালো থাকে।

অবসরে যাওয়া মানুষ হাতের অঢেল সময়কে ফলপ্রসূ করে তুলতে পারেন ছাদকৃষির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। অনেকে তা করছেনও। যাঁদের নিজস্ব ভবন ও ছাদ রয়েছে, তাঁরা নিজেদের ছাদে সবুজের এই আয়োজন গড়ে তুলছেন। যাঁদের নিজস্ব বাড়ির ছাদ নেই, তাঁরা বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে ছাদের এক পাশে বা বারান্দায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ছাদকৃষি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here