দাহ্য রাসায়নিক পদার্থেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ

0
90

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে ছিল অন্তত ১৬ কনটেইনার হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। প্রায় ৪০ ফুট লম্বা কনটেইনারগুলোয় রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য রাখা হয়েছিল। রাসায়নিক এই পদার্থকে প্রাথমিকভাবে ভয়াবহ বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসসহ অগ্নিনির্বাপণ সংশ্লিষ্টদের অনুমান, বেসরকারি এই ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে রক্ষিত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডবোঝাই কনটেইনারেই আগুন ধরে। ভয়াবহ ও বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর তা পুরো ডিপোতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কনটেইনারগুলো একে একে বিস্ফোরিত হতে থাকে। শনিবার রাতের পর রোববার দিনেও একের পর এক কনটেইনার বিস্ফোরিত হয়। দাহ্য রাসায়নিক পদার্থে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বিশাল অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এতে হতাহতের ঘটনা ছাড়াও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনিল্যান্ড কনটেইনার ডিপো’স অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)। সংগঠনটির মতে, এর মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার রপ্তানি ও ৪০০ কোটি টাকার আমদানি পণ্য নষ্ট হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

দীর্ঘসময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার পেছনে ডিপো কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শনিবার রাত ১০টার দিকে আগুন লাগলেও রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা ঘটনাস্থলে ডিপো কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রায় ২৬ একর আয়তনের বিশাল ডিপোটির কোথায় কোন ধরনের কনটেইনার আছে, তা বুঝতেই পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে তাদের।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো’স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব রুহুল আমিন শিকদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি যতটুকু তথ্য পেয়েছি, আগুন লাগার সময় ডিপোটিতে সাড়ে চার হাজারের মতো কনটেইনার ছিল। এর মধ্যে ৮০০টি রপ্তানি ও ৫০০টি আমদানি মিলিয়ে মোট পণ্যবোঝাই কনটেইনার ছিল প্রায় ১৩০০। বাকিগুলো খালি। রপ্তানি কনটেইনারের মধ্যে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডবোঝাই কনটেইনার ছিল ১৬ থেকে ১৮টি। এগুলো ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার হতে পারে। ঘটনাটি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থেকে হয়েছে কি না, আমরা নিশ্চিত নই। এটি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন।’

তিনি জানান, রাসায়নিক পদার্থগুলো রপ্তানির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল। এ ধরনের পণ্য হ্যান্ডলিং করার অভিজ্ঞতা প্রাইভেট আইসিডিগুলোর রয়েছে। আইসিডিগুলো যেহেতু শতভাগ রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং করতে পারে, তাই এ ধরনের রাসায়নিক রাখার অনুমতিও তাদের রয়েছে।’

বিকডার এই কর্মকর্তা জানান, তারা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব নিরূপণ করেছেন। এই হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের রয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ পণ্য। আমদানি পণ্য পুড়ে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার। এর বাইরে ডিপোর অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ‘রাসায়নিক পদার্থগুলো কম্বোডিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল। তবে কম্বোডিয়া এই চালানের শেষ গন্তব্য, নাকি সেখান থেকে অন্য বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাসায়নিকের রপ্তানিকারকের বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। এগুলো স্মার্ট গ্রপের নিজেদের পণ্য হতে পারে, এমনটি শুনেছি। কিন্তু ডকুমেন্ট না দেখে নিশ্চিত করে এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’ প্রত্যক্ষদর্শী ও অগ্নিনির্বাপণ কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার সূত্রে জানা যায়, আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ডিপোটিতে যায়। এরপর রাত ১০টার দিকে আগুন নেভানোর সময় ভয়াবহ শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়লে আগুনের ভয়াবহতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে আশপাশের প্রায় ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অনেক বাসাবাড়ির জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। ভূমিকম্প হচ্ছে মনে করে এ সময় অনেকে আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। বিস্ফোরণ ও আগুনে ফায়ার সার্ভিস কর্মী, পুলিশ সদস্য, পণ্য লোডিং-আনলোডিংয়ে নিয়োজিত ডিপো শ্রমিক, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক এবং আগুন নেভাতে সহযোগিতা করতে আসা স্থানীয় লোকজন হতাহত হন।

সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনালের মো. মাইন উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে মালিকপক্ষের কাউকে পাচ্ছি না। তাদের পেলে জানতে পারতাম, কোন কনটেইনারে কী আছে। যেহেতু কেমিক্যাল, তাই জানা দরকার তা কোন ধরনের। একেক কেমিক্যালের নেচার একেক ধরনের। আমি বুঝতে পারছি না, এটা কোন ধরনের কেমিক্যাল। কীভাবে নির্বাপণ করব।

যার জন্য আগুন নেভাতে সময় লাগছে। বেগ পেতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর বিস্ফোরণ হচ্ছে। বিস্ফোরণের জন্য কাছেই যেতে পারছি না। আমরা ফায়ার সার্ভিস থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করেছি। তদন্ত শেষে জানা যাবে কীভাবে আগুন লেগেছিল।’

রাসায়নিক পদার্থ হ্যান্ডলিংয়ে ডিপো কর্তৃপক্ষের কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছি। তারা তদন্ত করে জানাবে কী অবস্থায় আছে, ওদের (ডিপো কর্তৃপক্ষের) কোনো ঘাটতি ছিল কি না।

তিনি বলেন, বিস্ফোরণ হওয়ায় এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় যদি আগুনটা নিভিয়ে ফেলা যেত, তাহলে এত ব্যাপকতা হতো না।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেরই আনুমানিক ক্ষতি ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ-এর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এছাড়া তিনি দুর্ঘটনার জন্য ডিপো ও এর রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আছে বলে মনে করেন।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে এই ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে একটা বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। এতদিন বলা হচ্ছিল কমপ্লায়েন্স-গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি হেলথ ও ফায়ার সেফটি মানে না। এই ঘটনা এখন আরও বড় হয়ে উঠবে। এই ক্ষতি বড় ধরনের অশনিসংকেত। কারণ, কোভিড ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তাতে ছন্দপতন হবে। আন্তর্জাতিকভাবে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। যার ক্ষতি হবে দীর্ঘমেয়াদি।’

তিনি বলেন, আইসিডিগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের বড় বড় সব বায়ারের পণ্য যায়। এগুলোয় যদি সঠিকভাবে কমপ্লায়েন্স মানা না হয়, হেলথ সেফটি, ফায়ার সেফটি না থাকে, রেগুলেটরি বোর্ড যদি কাজ না করে, তাহলে এরকম দুর্ঘটনা আরও হতে থাকবে। যারা মনিটরিং করে, ডিপোর লাইসেন্স দিয়েছে, তাদের গাফিলতি আছে নিশ্চয়ই। ডিপো কর্তৃপক্ষ ফায়ার সেফটি নিয়মিতভাবে হয়তো মেনটেইন করেননি। তাই তাদেরও গাফিলতি আছে।

বিজিএমইএ সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী জানান, ডিপোটিতে ফোরএইচ গ্রুপ, কেডিএস, প্যাসিফিক জিনসসহ বড় বড় কারখানার রপ্তানি পণ্য ছিল। এইচএনএমসহ বিশ্বের খ্যাতিমান বায়ারদের পণ্য ছিল। তাই দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এটা একটা বড় ধাক্কা।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো স্থাপনের অনুমতি দেয় সরকার। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে বেসরকারি খাতে আইসিডির কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আইসিডি স্থাপনের অনুমতি দিয়ে থাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আর ছাড়পত্র দেয় বন্দর। বেসরকারি আইসিডি স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সরকারের নীতিমালা রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে ১৯টি বেসরকারি আইসিডি গড়ে উঠেছে। আইসিডিগুলো রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং আমদানি পণ্যের ২৫ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে থাকে। বিএম কনটেইনার ডিপো নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি এলাকায় কার্যক্রম শুরু করে। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের এটি একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here