পাবনার নদ-নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন ভূগর্ভস্তরের কাঠামোর পরিবর্তণ হচ্ছে

0
19

শফিউল আযম ঃ
পাবনা জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ-নদীর ভূউপরিভাগে উচ্চ ক্ষমতার ইঞ্জিন বসিয়ে ভূঅভ্যন্তরের কাঠামো ভেঙ্গে তছনছ করে বালু উত্তোলনের অশুভ তৎপরতা কোন ক্রমেই বন্ধ হচ্ছে না। ড্রেজার, ভলগেট, বোমামেশিন নানা নামে উচ্চ শক্তির শ্যালোইঞ্জিন বসিয়ে নদীর তলদেশের ২৫-৩০ ফুট গভীর থেকে বালু উত্তোলন করায় ভূস্তর ও নদীর বেড লেভেল (তলদেশ) এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। হুমকীর মুখে পড়েছে জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে শ্যালো ইঞ্জিন আটক করে পুড়িয়ে দেয়। কিছুদিন নীরব থাকার পর বালুদস্যুরা আবারো মাঠে নামে। মিডিয়া সরব হয়। ফের প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। দিন কয়েক পর অবস্থা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যায়।
নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গত শতকের ৯০’র দশকের শেষ দিকে পাবনা জেলায় যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা শুরু হয়। পরে সিরাজগঞ্জ হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। পাবনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে অধিক পরিমান বালু উত্তোলন করায় তলদেশে কতটা ফাঁকা বা ভ্যাকুয়ামের সৃষ্টি হয়েছে তা পরীক্ষা করা হয়নি। বালু উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্তরে কাঠামোগত কতটা পরিবর্তণ হচ্ছে এই প্রশ্নে পাবনার পরিবেশবিদ আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ভূগর্ভের সাজানো স্তর এখন আর নেই। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে ভেঙ্গে এতটাই এলোমেলো হয়ে গেছে যে নদীর পানিতে অক্্িরজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র ও জলজপ্রাণী হুমকীর মুখে পড়েছে। রিখটার স্কেলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে বহু এলাকা দেবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাবনা জেলার পূর্ব, উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা, যমুনা, বড়াল ও হুড়াসাগর নদী থেকে ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে আসছে। তারা বোমামেশিন ও স্থানীয়ভাবে তৈরি ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে নদীর তলদেশের ২০-২৫ ফুট গভীর থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করছে। এতে নদী পাড়ের গ্রামগুলোর বাসতবাড়ী, ফসলী জমি, তীর সংরক্ষণ কাজ ও পুরাতন বণ্যানিয়ন্ত্রন বাঁধ, রেল ষ্টেশন, পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীডের টাওয়ার ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে।
যমুনা, পদ্মা, বড়াল ও হুড়াসাগর নদী পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে বালু বেচা-কেনার হাট বসেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু কেনা-বেচা হচ্ছে। ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জেল জরিমানাতে থামছে না অবৈধভাবে বালু উত্তেলন। বিনা পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় প্রভাবশালী বালুসন্ত্রাসীরা জেল জরিমানা উপেক্ষা করে নদী থেকে বালু উত্তোলনসহ প্রকাশ্যে বেচা-কেনা অব্যহত রেখেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নদী পাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছে, বালু বিক্রি টাকার ভাগ উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের কিছু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি পাচ্ছেন। সে জন্য চিহিৃত বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যাদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের বনিবনা হচ্ছে না, শুধু মাত্র তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণেই পাবনার ৫টি নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবনার বড়াল নদীতে ফরিদপুর উপজেলার ড়েমরা ঘোষপাড়া, সাঁথিয়ার পাথালিয়া হাট, চিথুলিয়া, হুড়াসাগর নদের বেড়ার মোহনগঞ্জ, ডাকবাংলা, যমুনা নদীর পেঁচাকোলা, নটাখোলা, হরিরামপুর, কাজীরহাট, খানপুরা, পদ্মা নদীতে ঢালারচর রেল ষ্টেশন, সুজানগর উপজেলার চরভবানীপুর, চরসুজানগর, হাজারবিঘা, লক্ষীপুর, চরবিশ্বনাথপুর, চরতারাপুর নাজিরগঞ্জ, সাতবাড়ীয়া, বাঠপাড়া, রাইপুর, গোপালচন্দ্রপুর, হাসামপুর, বর্খাপুরসহ পদ্মা ও যমুনার নদীর প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকার শতাধিক পয়েন্টে বোমামেশিন ও স্থানীয়ভাবে তৈরি শক্তিশালী ড্রেজারের, ভলগেট ও বোমামেশিনের সাহায্যে নদীর তলদেশে থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশের ভূস্তর তছনছ হয়ে গেছে। এতে ¯্রােতধারা গতিপথ পরিবর্তন করায় গত এক বছরে নদী ভাঙনে দেড় সহ¯্রাধিক বসতবাড়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দিরসহ ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
বেড়ার নটাখোলায় অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার থেকে যমুনা নদী ১৫০ মিটার দুর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নটাখোলায় বালু উত্তোলনের ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীডের টাওয়ার ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজীরহাট ও নটাখোলা এলাকায় এই বালু উত্তোলন সাথে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। কাজীরহাটের ভাটিতে পদ্মার পাড়ে ঢালারচর অবস্থিত। পাবনা থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেল লাইন ও ষ্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। ঢালারচরে রেল ষ্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় নদী ষ্টেশনের দিকে সড়ে আসছে। কাজীরহাট থেকে ঢালারচর পর্যন্ত পদ্মা নদীতে বালু উত্তোলনের সাথে ওই চক্রটি বলে অভিযোগ উঠেছে। সাঁথিয়ার সোনাতলায় সাবেক এক মন্ত্রীর আত্মীয় ও দলীয় কিছু নেতা সুতিখালি নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রির জন্য স্তুপ করে রেখেছে। এতে প্রায় ২০০ বিঘা জমি ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পাবনার বেড়া ও সুজানগর উপজেলার যমুনা ও পদ্মা অববাহিকার প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই রয়েছে বালু উত্তোলনকারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য। সুজানগর উপজেলার চরভবানীপুর, চরসুজানগর, লক্ষীপুর, চরবিশ্বনাথপুর, চরতারাপুর এলাকাজুড়ে প্রতিদিন ৬০-৭০টি ভলগেট ও বোমামেশিনের সাহায্যে নদীর তলদেশের ২০-৩০ ফুট কোথাও এর চেয়ে বেশি গভীর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে ট্রলার ও নৌকায় করে পাড়ে আনা হচ্ছে। আবার কোথাও নদী থেকে মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি নদী পাড়ে এনে রাখা হচ্ছে। এদিকে হুড়াসাগর ও যমুনা নদী পাড়ের কাজিরহাট, নটাখোলা, হরিরামপুর, বেড়া ডাকবাংলা, বৃশালিখায় বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর দক্ষিণপাড়ে বালু বেচা-কেনার হাট বসেছে। বালুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে। বালু মজুতের বিভিন্ন পয়েন্টে থেকে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক বালু জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষাধিক ঘন ফুট বালু বিক্রি করে সংশ্লিষ্টরা হাতিয়ে নিচ্ছে আট থেকে ১০ লাখ টাকা। এদিকে সরকার রাজস্ব বিপুল পরিমান আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নটাখোলা, কাজীরহাট ঘাট হয়ে ভাটিতে ঢালারচরে যমুনা নদী থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমান বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সেখানে একাাধিক ভলগেট, ড্রেজার ও বোমামেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে বড় বড় নৌকা অথবা কার্গোজাহাজ বোঝাই করে নগরবাড়ীর অদুরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর পর সেখান থেকে দীর্ঘ পাইপের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু এনে রাখা হয় নগরবাড়ী ঘাটের পাশে খোলা জায়গায়। সেখান থেকে ট্রাক বোঝাই করে বালু পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানভেদে প্রতিট্রাক বালু বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০টাকা থেকে দুই হাজার টাকা দরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, বেড়া ও সুজানগর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ ট্রাক বালু বিক্রি করা হচ্ছে। এই বালু বিক্রির টাকার ভাগ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে থাকে।
বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হামিদ এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, ভাঙন প্রতিরক্ষা কাজের পাশ দিয়ে যমুনা ও পদ্মা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর যে কোনো পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন প্রতিরক্ষা কাজের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। নদীর যে স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হয় তার চার পাশের এলাকা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে জন্য প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই সম্ভাব্য ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (সুজানগরের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত) আসিফ আনাম সিদ্দিকী বলেছেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছিলাম। যদি আবার তারা বালু উত্তোলন শুরু করে থাকে তবে দ্রুততম সময়ে মধ্যে তা বন্ধ করতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here