পাবনায় এবার রেকর্ড পরিমান পেঁয়াজ উৎপাদন ভাল দাম পেয়ে চাষিরা খুশি

0
233

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা ঃ
পাবনা জেলায় এবছর ৩৯ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে রেকর্ড পরিমান প্রায় ছয় লাখ এক হাজার টন পেঁয়াজ হয়েছে। এদিকে বাম্পার ফলন ও ভাল দাম পাওয়ায় পেঁয়াজ চাষিরা খুশি। গত বছর মওসুমের শুরুতে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। এবার প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে। সামনে রমজান মাসে পেঁয়াজের দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মওসুমে পাবনা জেলায় ৩৯ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয় পাঁচ লাখ ৭০ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছে ছয় লাখ এক হাজার টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ হাজার ৬৬৬ টন বেশি। সুজানগর উপজেলায় ১২ হাজার ৮০০ হেক্টরে এক লাখ ৯৫ হাজার টন, সাঁথিয়ায় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টরে এক লাখ ৭৫ হাজার টন, পাবনা সদরে পাঁচ হাজার হেক্টরে ৭৫ হাজার টন, ঈশ্বরদীতে দুই হাজার ২১০ হেক্টরে ৩৩ হাজার ১৫০ টন, বেড়ায় দুই হাজার ২০০ হেক্টরে ৩৩ হাজার টন, ফরিদপুরে এক হাজার ১০০ হেক্টরে সাড়ে ১৬ হাজার টন, চাটমোহরে এক হাজার ১০০ হেক্টরে সাড়ে ১৬ হাজার টন, ভাঙ্গুড়ায় এক হ্াজার হেক্টরে ১৫ হাজার টন ও আটঘড়িয়ায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সাড়ে ২২ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। জেলার সুজানগর ও সাঁথিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজাহার আলী জানান, এ প্রতিবেদককে জানান, চলতি বছর এ অঞ্চলের ২৫ হাজার কৃষক ফরিদপুরি, তাহেরপুরী ও মিটকা জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। তবে তাহেরপুরী জাতের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। প্রায় ৩৯ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রতি হেক্টরে সাড়ে ১৩ টন হিসেবে প্রায় পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৩৩৪ সাত হাজার টন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় পেয়াজ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ছয় লাখ এক হাজার টন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের কৃষকেরা ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), এবং ইউরিয়া সারের পরিবর্তে কম্পোষ্ট সার বেশি প্রয়োগ করেন। এতে কৃষকদের অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি পেঁয়াজের ফলন, আকার, রঙ ও গুনগতমান খুব ভাল হয়েছে। দেশের সর্বাধিক পেঁয়াজ উৎপাদন হয় পাবনা জেলায়।
গতকাল শনিবার বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটে প্রচুর পরিমানে নতুন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। মধ্য চৈত্র মাস থেকে পাবনার কাশিনাথপুর, বনগ্রাম, আতাইকুলা, বোয়ালমারি, ধুলাউড়ি হাটে নতুন পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। চট্রগ্রাম, সিলেট, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বেপারী, পাইকার ও বাঁধাই ব্যবসায়ীরা আরৎদারের মাধ্যমে হাট থেকে চাহিদা অনুয়ায়ী পেঁয়াজ কিনছেন। পরে পেঁয়াজ বস্তায় ভরে ট্রাকে করে সড়ক পথে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। সপ্তাহের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এই দুই দিন হাট বসে। হাটে মান ভেদে প্রতি মন পেঁয়াজ ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চতুরহাটে সুজানগর ও সাঁথিয়া এলাকার কৃষক আজিম, আহাদ আলী, অমল দাস, রজব আলী অনেকেই জানান, পেঁয়াজ আবাদে প্রতিদিন একজন কৃষি শ্রমিককে দিতে হয় ৪০০ টাকা। এছাড়া তিন বেলা খাবারও দিতে হয়। খাকছাড়া গ্রামের রমজান আলী জানান, প্রতি বিঘা জমিতে বীজ আড়াই হাজার টাকা, চারা তৈরি এক হাজার ৫০০ টাকা, চারা রোপন থেকে পেঁয়াজ তোলা পর্যন্ত ৪০ জন শ্রমিক প্রয়োজন হয়। এই ৪০ জন শ্রমিকের শ্রমমূল্য ও খাবার বাবদ খরচ হয় ২৪ হাজার টাকা। রাসায়নিক সার ও কম্পোষ্ট সার এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা, এবং সেচ খরচ লেগেছে ৫০০ টাকা। নিড়ানীতে লেগেছে এক হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া পরিবহন খরচসহ প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ৩৪ হাজার টাকা।
পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার চাকলা, খাকছাড়া, তারাপুর, আমিনপুর, আহম্মদপুর, মনমথপুর, মানিকহাট, উলাট, বামনদি, চরদুলাই এলাকার কৃষকেরা এ প্রতিনিধিকে জানান, প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মন। তবে সাঁথিয়া উপজেলার আফড়া গ্রামের কৃষক অজয় দাস পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে প্রতি বিঘায় গড়ে ৭০ মন পেঁয়াজ উৎপাদন করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। এবার প্রতি মন পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে। অর্থাৎ কৃষকেরা প্রতি বিঘা জমির পেঁয়াজ বিক্রি করছেন থেকে ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় খরচ বাদে লাভ থাকছে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। তারা জানান, এ বছর পেঁয়াজের রঙ, আকার ও গুনগতমান খুবই ভাল হয়েছে। এ অঞ্চলে গত এক দশকের মধ্যে পেঁয়াজের এমন বাম্পার ফলন পাওয়া যায়নি। এছাড়া পেঁয়াজবীজের ফলনও ভাল হয়েছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজাহার আলী বলেন, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় শুধু পেঁয়াজেরই বাম্পার ফলন হয়নি। ডাল, মসলা জাতীয় ফসল এবং গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। যদি কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হয় তাহলে এ অঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here