পাবনায় সরিষার হলুদ ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন

0
20

শফিউল আযম ঃ
ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির ঝরা ঘাসে, সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে। আমার সাথে করতে খেলা প্রভাত হাওয়া ভাই, সরষে ফুলের পাপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই। কবি জসীমউদ্দীনের রাখাল ছেলে কবিতায় লেখা এই পঙক্তিগুলো কথাই যেনো মনে করিয়ে দেয় সেই আহŸান। সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হাওয়ার সুখে মন ছুটে যায় এমন অবারিত পুষ্পে শোভিত সোনালী মাঠে।
পদ্মা-যমুনা নদীর পলি মিশ্রিত চরের মাঠভরা সরিষা ফুলে গন্ধ বাতাসে ভাসছে। দিগন্ত জোড়া হলুদের বিস্তার। আজ মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পাবনা জেলার পদ্মা-যমুনার ২৫টি চরসহ তার আশে পাশের গ্রামের পর গ্রামের ফসলি মাঠের চারপাশ ভওে উঠেছে হলুদেও ঘ্রাণ আর সৌরভে। গার হলুদ বর্ণেও এ ফুলে মৌ-মাছিরা গুন গুন করে মধু আহরণ করছে। দুর থেকে সরিষার ক্ষেতগুলো দেখে মনে হয়, কে যেন হলুদ চাদর বিছিয়ে রেখেছে। রোদে ঝলমল করছে সরিষা ফসলি জমি। হলুদের সমারোহে সজ্জিত সরিষার প্রতিটি ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। সরিষার ব্যাপক ফলনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। হলুদ সরিষার ফুলের অবারিত সৌন্দর্য এখন লুটিপুটি খাচ্ছে পাবনা জেলার ৯টি উপজেলার মাঠে মাঠে। শীতের কুয়াশাকে উপেক্ষা করে চাষিরা সরিষার ক্ষেতের যতœ নিচ্ছেন।
আবহাওয়া অনুকুলে এবং সার বীজ সঙ্কট না থাকায় সরিষা বীজ বুনে ভাল ফলনের আশা করছেন চাষিরা। মাঠের পর মাঠ প্রকৃতিতে যেন অন্য এক মাত্রা এনে দিয়েছে। হলুদ সরিষা ফুলের মৃদু সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের এখানে-সেখানে। যেকোন মাঠে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সোনাঝরা এ ফুলের সীমাহীন ফসলি জমির বাগান। আকাবাকা মেঠো পথ, দু’পাশে দিগন্ত হারানো হলুদেও সমারোহ। ফসল ক্ষেতের সর্বত্রই এখন হলুদ রঙের গালিচা বিছিয়েছে প্রকৃতি।
পাবনার বেড়া উপজেলার চরনাগদা গ্রামের আবুল, হাসেম আলী, আফতাব প্রামানিকসহ কয়েকজন কৃষক জানান, এবার সরিষার বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। মাঠের পর মাঠজুড়ে বিরাজ করছে থোকা থোকা হলুদ ফুলের দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সরিষা ফুল আকৃষ্ট করছে মৌমাছিসহ প্রকৃতিপ্রেমীদের। আর এক মাস পরই সরিষা উঠবে তাদের ঘরে। তারা আরও জানান, সরিষা চাষ লাভজনক হওয়ায় আবাদে মনোযোগ দিয়েছে এলাকার কৃষকরা।
সুজানগর উপজেলার সরিষা চাষি আব্দুল জব্বার বলেন, চার বিঘা জমিতে তিন ধরনের সরিষা আবাদ করেছি। ক্ষেতে বেশ ফুল ফুটেছে। আশা করছি ফলন ভাল হবে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সরিষা ফুলের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। তিনি জানান, আগাম জাতের দুই সপ্তাহের মধ্যে ঘরে তোলা হবে। সরিষা চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, মাঠের পর মাঠের সরিষার ফুল আকৃষ্ট করছে মৌমাছিসহ প্রকৃতিপ্রেমীদের। ম্যেমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সরিষার ক্ষেত। অনেক ক্ষেতে মৌ চাষিরা মৌচাক বসিয়েছেন। তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন।
ফরিদপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামের সরিষা চাষি আজিজ জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় তার ব্যয় হয়েছে এক হাজার টাকা করে। ফলন ভাল হলে প্রতি বিঘায় ৫ মণ সরিষা পাওয়া যাবে। গত বছর প্রতি মণ সরিষা বিক্রি করেছেন তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকা দরে। বাজার দর ভালো পেলে এবারও তিনি সরিষা বিক্রি করে লাভবান হবেন। একই এলাকার আরেক চাষি গুলজার জানান, দেড় বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। প্রতি বিঘা জমিতে এক হাজার ২০০ টাকা করে ব্যয় হয়েছে। সরিষার ফুলে ক্ষেত ভওে গেছে। ফলন ভালো হলে বিঘা প্রতি সাড়ে চার থেকে ৫ মণ সরিষা পাওয়া যেতে পারে।
চরনাগদার বর্গাচাষি আশরাফ জানান, চার বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। সরিষা ফুলে ক্ষেত ভওে গেছে। দেখে খুব ভাল লাগছে। আশা করছি আবহাওয়া ভালো থাকলে ও জাত পোকার আক্রমন থেকে সরিষা ক্ষেত রক্ষা করতে পারলে সরিষার ব্যাপক ফলন হবে। বিক্রি করে লাভবান হতে পারবো। ফলন ভালো হলে এবং বর্তমান বাজার দর ঠিক থাকলে প্রতি বিঘায় ১০-১১ হাজার টাকা লাভ হবে। সরিষার ক্ষেতকে জাত পোকার আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এদিকে সরিষার হলুদ ফুলে দুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন বাম্পার ফলনের হাতছানিতে কৃষকের চোখেমুখে আনন্দের রেখা ফুটেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরিষা ফুলের হলুদ রঙে অপরুপ শোভা ধারণ করেছে মাঠঘাট। মাঠে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণি। সরিষার ফুলের চারপাশে মৌমাছির আনাগোনা বেড়ে গেছে। কৃষি বিভাগের মতে পাবনা জেলায় এবার সরিষার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চলতি মওসুমে এই জেলায় সরিষার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। নিন্মচাপের প্রভাবে সারা দেশে বৃষ্টি হওয়ায় সরিষার ফলনে কিছুটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র মতে, গত বছর জেলায় ৩২ হাজার ৯৪২ জেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল। গত মওসুমে সষিার ভালো দাম পাওয়ায় চলতি মওসুমে চাষিরা সরিষা চাষে ঝুকে পড়ে।জেলা সদর, বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, ঈশ্বরদী, আটঘড়িা, চাটমোহর, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় সরিষা আবাদ বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টরে। আর এক মাসের মধ্যেই ক্ষেত থেকে সরিষা তোলা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করবেন চাষিরা। উন্নত জাতের বীজ, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের পাশে ছিল বলে বেড়া উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা মোঃ মশকর আলী জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here