পাবনা-সিরাজগঞ্জের খামারিরা করোনায় লোকসান আতঙ্কে ভূগছেন

0
88

শফিউল আযম ঃ
গবাদিপশু সমৃদ্ধ পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু-মহিষ কোরবানির বাজার ধরার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। গোখামাারী, চাষি, মওসুমি ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গবাদিপশু মোটাতাজা করে এখন করোনা আতঙ্কে ভূগছেন। তাদের দুশ্চিন্তা করোনা পরিস্থিতি যদি ঈদুল আজহা পর্যন্ত স্থায়ী হয় তাহলে গবাদিপশু বেচাকেনা হবে অনেক কম। সেক্ষেত্রে তাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
খামারিরা বলছেন, করোনার এই ক্রান্তিকালে তারা গবাদিপশু নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন। সারাবছর গরু মোটাতাজাকরণ করে অনেকে বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তবে ঈদে গরু বিক্রি করতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে চিন্তা যাচ্ছে না তাদের। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামের বিধাব, বেকার যুবক ও কৃষক থেকে শুরু করে হাজারো মানুষ গরু,মহিষ, ছাগল, ভেড়া পালন করে। এখন অনেক শিক্ষিত যুবক গরু মোটাতাজাকরণকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যে কারণে পাবনা-সিরাজগঞ্জ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় বড় গরু ছাগলের খামার গড়ে উঠেছে। সারাবছর কসাইদের কাছে বিক্রির পাশাপাশি কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে স্পেশাল গরু,মহিষ তৈরি করেন খামারিরা।
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, জেলা দু’টিতে তালিকাভূক্ত প্রায় ৪২ হাজার গোখামার রয়েছে। এছাড়া জেলার গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে গবাদিপশু পালন কার হয়। এ অঞ্চলে গোখামারের পাশাপাশি প্রায় ৪০ হাজার মওসুমী ব্যবসায়ী ও কৃষকের গোয়ালে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হয়েছে। কোরবানির ঈদ বাজারে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মুন্সিগঞ্জ থেকে বেশি গরু সরবরাহ হয়ে থাকে।
পাবনার ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের একাধিক খামারীরা ও চাষিরা জানিয়েছেন, প্রকৃতিক নিয়মে মোটাতাজা গরুর মধ্যে রয়েছে, হাই ব্রিড জাতীয় পাবনা ব্রিড, অষ্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং পদ্ধতি যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত গরু। এসব ব্রান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় বড় করে বাজারে তোলা হয়। গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি। বিশেষ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত ইউরিয়া, লালিগুড় ও খড়ের একটি বিশেষ মিকচার আট দিন কোন পাত্রে বন্ধ করে রেখে তা রোদে শুকিয়ে গরুকে খাওয়াতে হয়। তিন মাস এটা খাওয়ালে গরু খুব দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। এই গরুর মাংস মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।
সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামের খামারী আব্দুল জব্বার বলেছেন, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে খড়, লালিগুর, ভাতের মার, তাজা ঘাস, খৈল, গম, ছোলা, খোসারী, মাসকালাই ও মটরেরভূসিসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে ২৫টি গরু লালন-পালন করে মোটাতাজা করেছেন। এখন করোনা নিয়ে খুব আতঙ্কের মধ্যে আছেন। বর্ষায় গোচারণ ভূমি ডুবে যাওয়ায় গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এ কারণে গরু লালন-পালনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আরেক খামারি আব্দুল জব্বার মিয়া জানালেন, গরু মোটাতাজাকরণ করে আতঙ্কে আছেন। তিনি বললেন, সারাবছর গরু মোটাতাজাকরণ করে কোরবানির ঈদের অপেক্ষায় থাকেন। যদি গরুগুলো কোরবানিতে বিক্রি না হয় তাহলে আমাদের প্রচুর লোকসান দিতে হবে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রাউতারা গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলাম বললেন, করোনা কতদিন থাকবে সেটা কেউ পরিস্কার করে বলতে পারছে না। যদি কোরবানির ঈদ পর্যন্ত থাকে, তাহলে দুঃখের সীমা থাকবে না। গরু পালন করতে গিয়ে অনেকেই ধার-দেনা করেছেন। ঈদে গরু বিক্রি করতে না পারলে কি-ভাবে ধার-দেনা শোধ করবেন এ নিয়ে তারাদুশ্চিন্তায় আছেন। পোঁতাজিয়া গ্রামের আফাজ উদ্দিন জানালেন, প্রতি বছর কোরবানির ঈদেও এক দেড় মাস আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকার গরুর ব্যাপারীরা এ অঞ্চলে এসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু কেনা শুরু করেন। পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার পশুর হাটগুলো থেকেও তারা গরু কিনে দেশের বিভিন্ন জেলার হাটে বিক্রি করে থাকেন। এবার তাদের অনুপস্থিতির কারণে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারি ও সাধারন কৃষকরা।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার খামারি নান্নু মিয়া জানিয়েছেন, করোনার কারণে এবার গরু কেনায় বেপারীদেরে কোন আগ্রহ নেই। আগে ব্যাপারীরা গরু কেনার জন্য বারবার ফোন করত। আর এবার তাদের ফোন করছি, কিন্তু তারা ফোনই ধরধে না। আমার মতো বহু খামারিই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। খামারিরা আশঙ্কা করছেন, করোনার কারণে এবারের কোরবানির হাটে ক্রেতার অভাবে কম দামে গরু বিক্রি হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকে তারা চেষ্টা করছেন এখনই গরু বিক্রি করে দেয়ার।
পাবনার সবচেয়ে রড় গরুর ব্যাপারী বেড়া পৌর এলাকা পায়না গ্রামের আসাদুল্লা জানালেন, অন্যান্য বছর গরুর ব্যাপারীরা কোরবানির মাসখানেক আগে থেকেই ঢাকা ও চট্রগ্রামের কোরবানির হাটকে সামনে রেখে এই এলাকার খামারিদের কাছ থেকে গরু কিনতে থাকেন। কিন্তু এবার বেশির ভাগ ব্যাপারীই সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি খেয়াল করছেন। গত বছর এ সময় তিনি ৮০টি গরু কিনে ফেলেছিলেন, কিন্তু এবার এখনও কোনো গরু কেনেননি। তিনি বললেন, করোনার কারণে হাটে গরুর দাম ও চাহিদা কেমন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই তিনি গরু কিনছেন না।
উত্তরাঞ্চলের প্রধান পশুরহাট বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর খামারি ও কৃষক গরু বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু ক্রেতা নেই বললেই চলে। হাটে গরু বিক্রি করতে আসা সেলন্দা গ্রামের আব্বাস আলী বললেন, সকাল ৭টার দিকে বিক্রির জন্য পাঁচটা গরু আনছি। এহন বাজে ১২টা, কোনো ব্যাপারী দামই কয় নাই। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গরু কিনেছি। ভূসির দোকানে বাকি করে গরু পালন করেছি। এহন গরু বিক্রি না হলি বিপদে পড়ে যাবো।
সিঅ্যান্ডবি চতুর হাটের ইজারাদার মিজানুর রহমান উকিল জানালেন, হাটে ক্রেতাÑবিক্রেতাসহ সর্বসাধারণের জন্য মাস্ক ছাড়া প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু বেচাকেনা একেবারেই নেই। অন্য বছরের মতো ঢাকা, মানিকগঞ্জ, সিলেট, চিটাগংয়ের ব্যাপারীরাও আসছে না,্ কমবেশি যা বিক্রি হচ্ছে তা স্থানীয় ব্যাপারী ও কৃষকদের কাছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here