বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণই মূলত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ

0
36

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, স্থপতি এবং বিশ্বের সর্বহারা, নির্যাতিত, নিপীড়িত, মেহনতি ও অভুক্ত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। আবহমান বাংলার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের জাতীয় জীবনে আজ যেসব স্মরণীয় ব্যক্তি বিস্মৃতি উত্তাল তমসাকে বিদীর্ণ করে আপন কীর্তির মহিমায় দ্যুতিমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

অন্ধকার, পরাধীনতা, শাসন, শোষণ আর বঞ্চনার শিকল ভেঙে তিনি বাঙালি জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তাঁর আপসহীন সংগ্রাম, সাহস এবং দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য একনিষ্ঠ ভালোবাসা আর নেতৃত্বের কারণেই আজ আমরা স্বাধীন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল সোচ্চার।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে ঘোষণা করা হয় তখন বাঙালি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, যার ফলে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি তাদের প্রতিবাদ তীব্র থেকে তীব্রতর করে এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ জয়লাভ করলেও তারা ক্ষমতায় বসতে পারেনি।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে বাঙালি জাতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় পাকিস্তান প্রশাসনের পক্ষ থেকে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা (বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত), ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েও শাসনক্ষমতায় বসতে না পারা বাঙালি জাতিকে করে তোলে আন্দোলনমুখর।

এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজির হন বাঙালি জাতির স্বপ্নপূরণের দিশারি হয়ে এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ছিল মূলত বাঙালি জাতির বুকে তীব্র ক্ষোভে লালন করা এক শিখা। যেখানে তিনি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা ও অবহেলা থেকে মুক্তির ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন,
“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব।
এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

জয় বাংলা।”
পূর্বঘোষণা মোতাবেক বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ৭ মার্চ জনসমুদ্রে পরিণত হলো রেসকোর্স ময়দান। বিপদের সময় মানুষ সাহসী ও চরিত্রবান নেতৃত্বের নির্দেশনার আশ্রয় খোঁজে। এ জন্যই গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাঁর ভাষণ শোনার জন্য। বিকেল সাড়ে ৩টায় রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তাঁর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর এই ভাষণ এক অনন্য অসাধারণ ভাষণ হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল অলিখিত, যা তিনি বিশ্বাস করতেন, হূদয় দিয়ে যা অনুভব করতেন, তা-ই তিনি সেদিন তাঁর ভাষণে বলেছিলেন। তিনি তাঁর ভাষণে দেশকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলনের ডাক দেন তথা পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “…আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে…রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা।…” তিনি তাঁর ভাষণে দেশকে মুক্ত করতে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য বাঙালি জাতির প্রতি আহ্বান জানান এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। এটাই ছিল তাঁর স্বাধীনতার ডাক। তাঁর এই ভাষণ দেশবাসীকে প্রগাঢ় বৈপ্লবিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু শুধু তাঁর সামনে উপবিষ্ট ১০ লাখ মানুষের মাধ্যমে বাংলাদেশের আরো সাড়ে সাত কোটি অধিকারবঞ্চিত মানুষের উদ্দেশে এই ভাষণ দেননি, বিশ্বের শতকোটি অত্যাচারিত ও শোষিত মানুষকে তিনি এই ভাষণ দ্বারা স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে সেদিন বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আগুন ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠ থেকে। কোনো ভাষাবিদ বা ভাষাতাত্ত্বিক না হয়েও বঙ্গবন্ধু তাঁর সেদিনের বক্তব্যের গভীরতা, স্পষ্টতা ও বাচনভঙ্গির জন্য স্মরণীয়।

এই ভাষণের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সব অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, ব্যাংকসহ প্রশাসন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মতো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে লাগল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা ও ডাক। জাতির অস্তিত্বের লড়াইয়ে জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অসম যুদ্ধে তিনি সেদিন অবতীর্ণ হয়েছিলেন জনগণের একজন হিসেবে। এই ভাষণের দিকনির্দেশনায় জাতি সেদিন থেকেই যুদ্ধের পথে চলে গিয়েছিল। তাঁর ভাষণে তিনি বাংলার মানুষের সংগ্রাম ও বঞ্চনার কথা সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসন থেকে বাঙালির মুক্তির একমাত্র পথ হলো স্বাধীনতা, আর এই কথা তিনি তাঁর ভাষণের মাধ্যমে অত্যন্ত কৌশলে শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন। তাঁর ভাষণের প্রতিটি কথা মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে। এই ভাষণ বিশ্বের নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষকে যুগে যুগে অধিকার আদায় ও স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বের প্রকাশ পায়। যার ফলে সেদিন দেশের কুলি, মজুর, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার এবং সব পেশার মানুষ এক বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ হয়, যার ফলস্বরূপ আজ আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, জাতির পিতা এবং বিশ্ব পেয়েছে চিরস্মরণীয় একজন নেতা, যাঁর নেতৃত্ব অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে আছে।

১৯৬৬ সালের ছয় দফাকে আমাদের মুক্তির সনদ বলা হলেও তাঁর প্রকৃত রূপ দেখা গিয়েছিল ৭ মার্চের ভাষণে, কারণ ছয় দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন হলেও বাঙালি জাতি স্বাধীনতার আগে কখনোই ছয় দফা দাবি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে প্রকৃত মুক্তি নিহিত ছিল মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণে। কারণ এর ফলেই বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশে সমর্থ হয়।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে অনেকে বিশ্বের মহান নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস’, মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘I have a dream’ প্যাট্রিক হেনরির ‘Give me liberty or give me death’ ইত্যাদি ভাষণের সঙ্গে তুলনা করে। তবে তাঁদের বঙ্গবন্ধুর মতো সাড়ে সাত কোটি মানুষের আকাশছোঁয়া আশা-আকাঙ্ক্ষার চাপ ও সামরিক সরকারের অস্ত্রের মুখে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ভাষণ দিতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধুর ওপর জনগণের প্রত্যাশা ও চাপ ছিল সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করার। জাতি অপেক্ষায় ছিল তিনি কি আজই স্বাধীনতার ডাক দেবেন। বিশ্ববাসীও সেদিন উত্কণ্ঠিত ছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সঙ্গে আর কোনো আপস করবেন না, তিনি বাঙালি জাতিকে এত দিন স্বাধীনতার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবার সেই লক্ষ্য পূরণের দিকেই অগ্রসর হবেন। কিন্তু অত্যন্ত কৌশলী বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে কৌশলে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ডাক দিলেও পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানি সামরিক সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখলেন। তিনি জানতেন, ঢাকায় অদূরবর্তী সেনানিবাসে পাকিস্তানিদের এক ব্রিগেড সেনা (১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, ২২ বালুচ রেজিমেন্ট, ৩১ ফিল্ড রেজিমেন্ট, ৩০ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং চারটি সাঁজোয়া ট্যাংক), ১৬টি যুদ্ধবিমান ও ১৮টি সশস্ত্র হেলিকপ্টার সেদিন প্রস্তুত ছিল আক্রমণের জন্য। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে এই বিশাল বাহিনী লাখ লাখ মানুষের ওপর আক্রমণ রচনা করত। তা ছাড়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্বারা সভাস্থলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দাঙ্গাহাঙ্গামার আশঙ্কাও ছিল। তিনি বুঝতেন যে জনশক্তি যেকোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী। পাকিস্তানিদের নির্মমতা, ভয়াবহ ষড়যন্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর অনিবার্য অভিযানের তথ্য ও বাঙালির অভ্যুদয় ঠেকাতে পাকিস্তানিদের অসীম তত্পরতার মধ্যেও তিনি আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। অত্যাচারিত জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বঙ্গবন্ধু এই ভাষণ প্রদান করেন। কী অসাধারণ দেশপ্রেম থাকলে জীবনের পরোয়া না করে শত্রু পরিবেষ্টিত পরিবেশে নির্ভয়ে এমন বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়! অস্তিত্বের লড়াইয়ে তিনি জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এই ভাষণ প্রদান করেন। মহান নেতা জনগণের হূদয়ে নিজেকে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠা করেন। অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ালেন স্বাধীনতার এই সিংহপুরুষ এবং এর মাধ্যমেই নতুন আশা সঞ্চারিত হলো। তাঁর ছিল কল্পনাশক্তি, প্রেরণাশক্তি আর অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি। তিনি তাঁর বক্তৃতায় প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা না করেও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। সেদিন তাঁর সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—হয় সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা অথবা পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব কাঁধে না নিয়ে, বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। পাকিস্তান সামরিক সরকার তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করার পথ খুঁজছিল। কিন্তু এই বিষয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন বলে তাদের এমন কোনো সুযোগই দেননি। তিনি যে একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন তার মাধ্যমে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। এক হাজার ১০৮ শব্দসংবলিত ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের এই ভাষণের সঙ্গে সঙ্গেই কালজয়ী চেতনার মাধ্যমে ৭ মার্চ বাঙালি জাতি যুদ্ধের পথে চলে যায়।

৭ মার্চ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য অন্তিম মুহূর্ত, বঙ্গবন্ধুর জীবনের নতুন দিগন্ত ও শ্রেষ্ঠ সময় আর বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। জাতি তাঁর নির্দেশে পথচলা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে দীর্ঘ ২৩ বছরের অত্যাচার, অবিচার ও নিপীড়নের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সেদিন তিনি ছিলেন দুরন্ত সময়ের এক জীবন্ত চলচ্চিত্র। ৭ মার্চের ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালি যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। এই প্রস্তুতির পেছনে ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন এবং নির্বাচনে বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসির বিরূপ প্রতিক্রিয়া।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে সবাই অভিন্ন মত প্রকাশ করবেন এবং স্বীকার করবেন যে এটাই ছিল স্বাধীনতার ডাক এবং এই ভাষণই প্রমাণ করেছিল বঙ্গবন্ধু একজন কুশলী রাষ্ট্রনায়ক। ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্স ময়দান সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ আছে যে প্রতীয়মান হয় ৭ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন এবং ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার জনযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

ইতিহাসের ঝোড়ো হাওয়া যখন একটি জাতির ভাগ্য অনিবার্যভাবে ভেঙে চুরমার করে দিতে থাকে তখন বাংলার মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বঙ্গবন্ধু সবাইকে আত্মোত্সর্গের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন যে ভবিষ্যতে বাংলার মানুষের কল্যাণ, সংসারের শান্তি ও জীবনের সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। তিনি জানতেন এই মাটিতে নতুন জীবন জন্ম নিচ্ছে, যার জন্য বেদনা হবে প্রচুর কিন্তু সম্ভাবনা অজস্র। বাংলার মানুষ বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে বিশাল সোনালি ধানক্ষেত সৃষ্টি করেছে এবং এত দূর এগিয়ে আসার পর তারা আর পিছপা হবে না। হাজার বছরের বাঙালি জাতির অসম্পূর্ণ স্বাধীনতার গান সম্পন্ন করলেন তিনি। এই ভাষণে তিনি ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রদত্ত ভাষণে যে কথা বলেছিলেন ‘জুলুম মাত করো ভাই’, সেই কথাই তিনি আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন। যতই দিন যাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে। লন্ডন অবজারভারের সাংবাদিক Cyril Dunn তাই বলেছিলেন, “Mujib is a full blooded Bengali his courage and charm that flowed from him made him a unique superman in these times.”

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পুরো জীবন কাজ করে গেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো বলেন,
“আমি হিমালয় দেখিনি।
তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি।
ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় এই মানুষটি হিমালয়ের সমান।
এভাবে আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করলাম।”

এই কারণেই তাঁর ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে ইউনেসকো কর্তৃক ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ভাষণসহ মোট ৭৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথিকে একই সঙ্গে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ইউনেসকো পুরো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণ করে থাকে। মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে (এমওডাব্লিউ) ৭ মার্চের ভাষণসহ এখন পর্যন্ত ৪২৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগৃহীত হয়েছে।

বাঙালি জাতিকে অত্যাচার, নির্যাতন ও বন্দিত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে ৭ মার্চের ভাষণ পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সবাইকে আত্মোত্সর্গের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইতিহাসের ঝোড়ো হাওয়া যখন একটি জাতির ভাগ্য অনিবার্যভাবে ভেঙে চুরমার করে দিতে থাকে তখন তাদের ভাগ্য রক্ষার দিশারি হয়ে বাংলার মানুষের পাশে আবির্ভাব হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। এক হাতে ‘মৃত্যু’ আরেক হাতে ‘মুক্তির বার্তা’ নিয়ে যিনি ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে হাজির হয়েছিলেন বাংলার মানুষের মুক্তির দূত হয়ে এবং মৃত্যুর ভয়কে জয় করে তিনি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই বলাই বাহুল্য, ৭ মার্চের ভাষণই প্রকৃত অর্থে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

লেখক: চিফ লজিস্টিকস অফিসার
সদর দপ্তর লজিস্টিক এরিয়া, ঢাকা সেনানিবাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here