বাঘাবাড়িতে মিল্কভিটার ৫৫০ একর জমি বেহাত

0
21

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

প্রভাবশালীদের দখলে মিল্কভিটার রাউতারা বাথানের ৫৫০ একর জমি : নয়া দিগন্ত –

সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাঘাবাড়ি মিল্কভিটার গোচারণ ভূমির (বাথান) প্রায় ৫৫০ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে। মিল্কভিটার বাথান কমিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ওই জমি নিজেদের নামে জাল দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে জোরপূর্বক ভোগদখল করছেন। এতে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি।

মিল্কভিটা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এক অর্ডিন্যান্স বলে পাবনা জেলার সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাথান হিসেবে পরিচিত সমর্পিত খাস ও অর্পিত প্রায় এক হাজার ৮০০ একর জমি সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার নামে এককালীন লিজ প্রদান করেন। সেই থেকে দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতিগুলো মিল্কভিটা থেকে বার্ষিক লিজ নিয়ে রাউতরা বাথানের জমি গোচারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সমিতির কিছু কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী লোকেরা মিল্কভিটা ও ভূমি অফিসে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জমির ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে সেসব জমি ভোগদখল করে আসছেন। আবার অনেকেই বাথানের জমি গোচারণ ভূমি হিসেবে লিজ নিয়ে ঘাস চাষ না করে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন জানা যায়, স্বাধীনতার আগে চলনবিল অঞ্চলের সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার একর জমি গোচারণ ভূমি ছিল। জাল দলিল ও ভুয়া পত্তনি নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীরা জোরপূর্বক সেই গোচারণ ভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নেন। শাহজাদপুর উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, বর্তমানে বাথান এলাকায় গোচারণ ভূমির পরিমাণ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৪০০ একর। এর মধ্যে ফরিদপুর উপজেলায় প্রায় ১০০ একর খাস, শাহজাদপুর উপজেলায় সমর্পিত খাস ৭১২ দশমিক ৬৮একর ও অর্পিত ৫৭৯ দশমিক ১৬ একর গোচারণ ভূমি রয়েছে।

তবে মিল্কভিটা সমিতির ম্যানেজার জানান, বর্তমানে মাত্র ৮৫০ একর জমি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অবশিষ্ট ৫৫০ একর (এক হাজার ৬৫০ বিঘা) জমি ভুয়া দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি দখল করে নিয়েছেন। অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে সরকারি এই জমি উদ্ধারের জন্য সিরাজগঞ্জ আদালতে পৃথক ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি শাহজাদপুরের বাথান এলাকার বুড়িপোতাজিয়া কুঠিরভিটা, রাউতগাড়ি, রামকান্তপুর ও হান্নি মৌজায় ১০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। মিল্কভিটাভুক্ত কয়েকটি প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার পর এই বিস্তীর্ণ গোচারণ ভূমিকে (বাথান) কেন্দ্র করে পাবনা-সিরাজগঞ্জের দুগ্ধ অঞ্চলের বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদী পাড়ে স্থাপন করা হয় সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। মিল্কভিটার বাঘাবাড়ি ‘ক’ ও ‘খ’ অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে গো-খামারের সংখ্যা রয়েছে ২২ সহস্্রাধিক। বছরের ৯ মাস এই বাথানগুলোতে লক্ষাধিক গরু বিচরণ করে।

সমিতির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ভুয়া দলিল ও পত্তনির মাধ্যমে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে মিল্কভিটার জমি। অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে উত্তরের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি এখন সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। সমিতির কিছু কিছু কর্মকর্তা জমি লিজ নিয়ে ঘাসের পরিবর্তে ধান আবাদ করছেন। এতে বাথানে কাঁচা ঘাসের সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সদস্যরা বাথানের বেদখল হওয়া জমি দখলমুক্ত এবং ধান আবাদ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

শাহজাদপুর উপজেলা ভূমি অফিস জানায়, কিছু দখলদার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে এসে জমির মালিকানা দাবি করছে। তারা কোন দুগ্ধ সমিতিকে জমি লিজ না দেয়ারও অনুরোধ করে। ফলে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর ভুয়া আর এস রেকর্ড করার অভিযোগে ওই সব দখলদারদের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শাহজাদপুর উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) বাদি হয়ে আদালতে পৃথক ছয়টি মামলা করেন। শাহজাদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here