বেড়ায় শিক্ষার্থীদের টিফিনের জমানো টাকায় মানব কল্যাণ

0
181

শফিউল আযম ঃ
পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থী ওরা। সংখ্যায় ২৫ জনের মতো। ওদের কর্মকা- দেখলে যে কারোরই মনে পড়ে যাবে ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গানের কথা- ‘মানুষ মানুষের জন্য…।’
স্কুলের অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো ওরাও বাড়ি থেকে ঠিকই টিফিনের টাকা নিয়ে স্কুলে আসে। কিন্তু সেই টাকায় টিফিন না কিনে প্রতিদিনই টাকা জমিয়ে রাখে ওরা। শুধু তাই নয়, স্কুলে যাতায়াতের জন্য পাওয়া টাকাও জমানোর চেষ্টা করে ওরা। এ জন্য রিকশায় না উঠে যতদূর পারা যায় হেঁটেই ওরা যাতায়াত করে। এভাবে জমানো টাকায় দুস্থদের নানাভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে ওরা। এ জন্য ওরা ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত হয়েছে।
প্রায় তিন বছর ধরে সংগঠনের শিক্ষার্থীরা নিজেদের জমানো টাকায় অন্তত ১০ জন হতদরিদ্র অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করিয়েছে। বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই, খাতা, কলম কিনে দিয়েছে।
এরই মধ্যে দুস্থদের চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য ওরা ব্যতিক্রম এক উদ্যোগ নিয়েছে। জমানো টাকায় ওরা বেশ কিছু ওষুধ কেনার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্তচাপ মাপক, ডায়াবেটিস মাপক এবং থেরাপি ও নেবুলাইজার যন্ত্র কিনেছে। এসব যন্ত্র ও ওষুধ তারা পৌর এলাকার কানাইবাড়ি মোড়ে অবস্থিত ‘যায়েদ মেডিকেল হল’ নামের একটি ফার্মেসিতে রেখেছে। সেখান থেকে প্রকৃত দুস্থ রোগীরা বিনামূল্যে ডায়াবেটিস, রক্তচাপ মাপাতে পারবেন। এ ছাড়া দুস্থ রোগীরা বিনামূল্যে কিছু ওষুধ পাওয়ার পাশাপাশি থেরাপি ও নেবুলাইজেশনও করাতে পারবেন।
গত রোববার (৫ মে) সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীরা ফার্মেসিটির মালিকের কাছে চিকিৎসাসামগ্রী হস্তান্তর করে। বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য বেড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ জিল্লুর রহমান সেখানে উপস্থিত হন। এমন সেবামূলক কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের সাধুবাদ জানান।
শেখ জিল্লুর রহমান বলেন, ‘টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ওরা যে মহৎ কর্মকা- করে যাচ্ছে তা অনুকরণীয়। ওদের কর্মকা-ের খবর পেয়ে অভিভূত হয়ে আমি এখানে এসেছি। আমি চাই ওদের দেখে অন্যরাও দুস্থদের পাশে গিয়ে দাঁড়াক।’
‘যায়েদ মেডিকেল হল’ নামের ফার্মেসির মালিক রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘অর্থের অভাবে চিকিৎসা না হতে দেখে কয়েকদিন আগে ওরা দুই হাজার টাকা খরচ করে এক দুস্থ রোগীকে সুস্থ করেছে। এ ধরনের কাজ ওরা নিয়মিত করছে। ওদেরকে সমর্থন জানাতে ও কাজে সামিল হতে আমার দোকানে ওদের চিকিৎসাসামগ্রী রেখেছি। প্রকৃত অসহায় মানুষদের এগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হবে।’
চিকিৎসাসামগ্রী ফার্মেসিতে হস্তান্তরের সময় কথা হয় দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী বেড়া বিপিন বিহারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শাহেদ আলী, রোহান বারী; আলহেরা একাডেমি স্কুল এন্ড কলেজের নূর হোসেন; মিলেনিয়াম স্টার স্কুলের তানভির হোসেন, ট্যালেন্ট কিন্ডার গার্টেন স্কুলের রাহাত হোসেনসহ অন্তত ১০ জনের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেড়া বিপিন বিহারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গত বছর (২০১৮) এসএসসি পাশ করা মেহরাব হোসেন শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠনটির মূল সমন্বয়ক। মেহরাব বর্তমানে ঢাকার একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন।
মেহরাব জানায়, প্রায় তিন বছর ধরে তারা টিফিন ও যাতায়াতের পয়সা বাঁচিয়ে এভাবে দুস্থদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালে মাত্র দুই থেকে তিনজনকে নিয়ে তাঁরা এ ধরনের কাজ শুরু করেছিল। এখন শুধু বেড়াতেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী এ কাজে এগিয়ে এসেছেন। বেড়ার বাইরেও তাঁরা এ ধরনের কাজ শুরু করেছেন।
বেড়া পৌর এলাকার মানিক মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে ওরা আমার বিদ্যালয়ে গিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই, খাতা, কলম বিতরণ করেছে। নিজেরা কষ্ট করে অন্যের ভালো করার এমন দৃষ্টান্ত খুব একটা চোখে পড়ে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here