ভরাবর্ষায় নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী বন্দরে খোলা জায়গায় লাখ লাখ বস্তা সার

0
90

শফিউল আযম, ঃ
ভরাবর্ষা মওসুমে উত্তরাঞ্চলের বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী নৌবন্দর এলাকায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশ থেকে আমদানী করা লাখ লাখ বস্তা সার খোলা জায়গায় ষ্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। মাসের পর মাস খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদে শুকিয়ে জমাট বেঁধে যাওয়ায় এই সারের গুনগতমান কমে যাচ্ছে। এসব কারণে দেশি বিদেশি সার প্রতি বস্তায় ২ থেকে ৩ কেজি ওজনে ঘাটতি হচ্ছে। ফলে এই সার কিনে কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন। এছাড়া সারের ঝাঁঝাঁলো গন্ধে বায়ু দূষণ হচ্ছে বলে অভিয়োগ উঠেছে।
সরেজমিন বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী বন্দর ঘুরে সূত্রে জানা যায়, বিসিআইসি আমদানীকারকদের মাধ্যমে চীন, মিশর, সৌদি আরব, তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সার আমদানি করে থাকে। পরে বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওই সার উত্তরাঞ্চলের বাফার গুদামগুলোতে পৌঁছে দেয়া হয়। সুমুদ্র পথে বড় জাহাজে সার আমদানি করা হয়। এই সার লাইটারেজ জাহাজে আনলোড করে বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী বন্দরে আনা হয়। সেখান থেকে সড়ক পথে সার মজুদের জন্য উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে পাঠানো হয়। বাফার গুদামগুলোতে জায়গা না থাকায় বাঘাবাড়ীর বড়াল নদীর উত্তর-দক্ষিণ পাড়ে এবং নগরবাড়ীতে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী সারের বস্তা স্তুপ করে রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে শক্ত ও জমাট বেঁধে সারের গুনগতমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বন্দরের ট্রান্সপোর্ট এজেন্ট ও বিসিআইসি’র বাঘাবাড়ি বাফার গুদাম সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের পাবনা,সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, বগুড়া, শান্তাহার, জয়পুরহাট, রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, লালমনিহাটের মহেন্দ্রনগর, দিনাজপুর, পার্রতীপুর চরকাট, ঠাকুরগা, বিরামপুর ও গাইবান্ধায় বাফার গুদাম রয়েছে। গত বছরের সারে বাফার গুদামগুলো ভরা রয়েছে। ফলে বন্দরে যে পরিমান সার আসছে, তা বন্দর এলাকাতেই খোলা জায়গায় পড়ে থাকছে। এতে বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদে শুকিয়ে জমাট বেঁধে যাওয়ায় সারের কার্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এছাড়া ঝাঁঝালো গন্ধে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
সরেজমিন বাঘাবাড়ী বন্দরে গিয়ে জানা যায়, প্রায় ছয় মাস ধরে কয়েক লাখ বস্তা রাসায়নিক সার বন্দর এলাকায় মাটিতে ষ্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। বাঘাবাড়ী বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলে আসছে। নগরবাড়ী যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ের বিভিন্ন জায়গায় সারের বড় বড় স্তুপ পড়ে আছে। বাতাসে ভাসছে সারের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। উভয় বন্দরের আশপাশের এলাকায় এই গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সারের ঝাঁঝালো গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
এদিকে চট্রগ্রাম নৌবন্দর থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টন রাসায়নিক সার বোঝাই ১০টি কার্গো জাহাজ বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী নৌবন্দরে এসে নোঙর করেছে। অনেক জাহাজ আনলোডের অপেক্ষায় রয়েছে। নিয়মানুযায়ী জাহাজ বন্দরে পৌঁছার পর আনলোড করে সার ট্রাকযোগে বাফার গুদামগুলোতে পৌঁছে দেয়ার কথা। কিন্তু গুদামগুলোতে জায়গা না থাকায় এই সার মাসের পর মাস বন্দরেই পড়ে থাকছে।
বাঘাবাড়ী বন্দরে নোঙর করা এমভি জব্বার কার্গো জাহাজের চালক আলী নূর বললেন, চট্রগ্রম বন্দর থেকে আট হাজার বস্তা সার নিয়ে এসে চারদিন ধরে বাঘাবাড়ী বন্দরে বসে আছি। সার পরিবহন ঠিকাদাররা বলছেন, খুব শিগগিরই জাহাজ থেকে সার আনলোড করা হবে। অথচ বাফার গুদামে পাঠাতে না পারার কারনে দিনের পর দিন এভাবে বসে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের বিসিআইসি’র ডিলারদের যথাসময়ে সার উত্তোলনে অনীহা রয়েছে বলে সংশি¬ষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সারের ডিলার জানিয়েছেন, অনেক দিন ধরে সারের বস্তা খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় সার জমাট বেঁধে যাওয়ায় সারের গুনগত মানের কিছুটা পরিবর্তন হয়। কৃষকরা এই সার নিতে চায় না। কৃষকরা দেশি সারের প্রতি বেশি আগ্রহী। অথচ দেশি সার না দিয়ে চিন থেকে আমদানি করা সার দেয়া হচ্ছে। তবে ডিলাররা বলছেন, বাফার গুদামের সার জমাট বাধা এবং বস্তার ওজন কম থাকার কারনে কৃষকরা সার নিতে চায় না। এছাড়া প্রতি বস্তায় প্রায় ২ থেকে ৩ কেজি করে সার ওজনে কম পাওয়া যায়। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করা সারের বস্তার ওজন বেশি কম। এ বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
নগরবাড়ী বন্দরের লোড-আনলোড লেবার সরদার ইছাক আলী শেখ জানিয়েছেন, নগরবাড়ীতে বাফারগুদাম নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। এ কারনে জাহাজ থেকে সার আনলোড করে যমুনা নদীর তীরে খোলা আকাশের নিচে ষ্ট্যাক দিয়ে রাখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আওলাদ হোসেন বলেছেন, মাসের পর মাস সারগুলো খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে। এর তীব্র ঝাঁঝে চলাফেরা দুস্কর হয়ে পড়েছে। জননী ট্রান্সপোর্টের ম্যানেজার দুলাল দাস বলেছেন, নগরবাড়ী সরকারি গেজেটভূক্ত নৌবন্দর হলেও এখানে সরকারের নিজস্ব কোন বাফারগুদাম ছিল না। তবে বর্তমানে বাফারগুদামের নির্মাণ কাজ চলছে। উত্তরাঞ্চলের জন্য যে পরিমান সার নগরবাড়ী বন্দরে আসে, তাতে এখানে বাফারগুদাম নির্মাণ কাজ জরুরি ভিত্তিতে শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ইসমাইল হোসেন বলেন, নগরবাড়ী নৌবন্দরে বাফারগুদাম না থাকায় রাসায়নিক সার খোলা আকাশের নিচে ষ্ট্যাক দিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে পড়ে থাকায় এই সারের কার্যক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে।
সংশি¬ষ্ট একটি সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ী ও নগড়বাড়ী বন্দরসহ এ অঞ্চলের ১৪ টি বাফার গুদামে প্রায় এক লাখ টন রাসায়নিক সার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চায়না থেকে আমদানিকৃত নিন্মমানের সার রয়েছে। এই সারের গুনগতমান বাংলাদেশের কাফকো ও যমুনা সারের চেয়ে অনেক নিন্মমানের। এই নিন্মমানের সার সরবরাহের ক্ষেত্রে এক শ্রেনীর আমদানিকারক, বাফার গুদাম ইনচার্জরা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাঘাবাড়ী বাফার গুদাম ইনচার্জ এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, দেশে উৎপাদিত কাফকো ও যমুনার ইউরিয়া সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। চায়না থেকে আমদানি করা জমাট বাঁধা ইউরিয়া সারের চাহিদা খুবই কম। কারন এই সারের গুনগত মান নিয়ে কৃষকেরা আতঙ্কিত। তিনি আরো বললেন, এই সার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ময়েশ্চারের কারনে ইউরিয়া সার জমাট বেঁধে গেছে। তবে সারের গুনগত মান ঠিক আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here