সাঁথিয়ায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে ঘর নির্মাণে ব্যাপক দূর্নীতি ৩৭২টির মধ্যে ৩৬০টি ঘরই দুই ফুট করে উঁচু করতে হবে

0
56

শফিউল আযম, পাবনা থেকে সংবাদদাতা ঃ
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার অসহায় দুস্থদের জন্য নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতি করা হয়েছে। এখন আবার ৩৭২টি ঘরের মধ্যে ৩৬০টি ঘরই দুই ফুট করে উঁচু করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তদন্ত কমিটি আসার চিন্তায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার তড়িঘড়ি করে প্রায় ১০০টি ঘরের চাল খুলে উঁচু করার কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা আশ্রয়ণ-২ গ্রকল্পের ঘরগুলো ঘুরে দেখছেন। ঘর উঁচু করার ঘটনাটি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই এটিকে দুর্নীর্তি ঢাকতে নতুন ফন্দি বলে মনে করছেন।
বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে মাঝগ্রাম, করমজা মল্লিকপাড়া, ধুলাউড়ি পূর্বপাড়া, আতাইকুলা পুঠিগাড়ি, পাথালিয়াহাট ও সেলন্দার জয়রামপুরের শতাধিক ঘরের চাল খুলে দুই ফুট করে উঁচু করা হচ্ছে। ঘরে বসবাসকারীরা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। গত শুক্রবার ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়নের মাঝগ্রামের ১০টি ঘরের চাল খুলে ফেলা হয়। এর আগে ঘরগুলোর বাসিন্দাদের পাশে নতুন করে করা ১২টি ঘরে কিছু দিনের জন্য স্থানান্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় হত দারিদ্র গৃহহীনদের প্রথম পর্যায়ে ৩৭২ টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘরগুলোতে অধিকাংশই পরিবার বসবাস শুরু করছে। পরবর্তিতে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। সারা দেশে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের দূর্নীতির তদন্তের কথা শুনে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতির নির্দেশে ঘর ভেঙ্গে দুই ফুট উচু করে পুণরায় ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন।
সরকারি পরিপত্রে সারা দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্ম শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় স্বস্ব উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের। ইতোমধ্যে ঘর নির্মাণে অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগে বেশ কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওএসডি করা হয়েছে। এই ভয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘরগুলো পূণরায় ২ ফুট উঁচু করা হচ্ছে।
জানা গেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ণ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ কুষ্টিয়া জেলার মীরপুরের পছন্দের ঠিকাদার মোঃ মঈন মন্ডলকে দিয়ে এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই ইট, বালু, রড, সিমেন্ট ও টিন ক্রয় করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ মোতাবেক ঠিকাদার ঘর নির্মাণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে। ঠিকাদার মোঃ মঈন মন্ডল নিজে ও তা স্বীকার করেছেন। সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ই্উএনও থাকাকালে ঠিকাদার মোঃ মঈন মন্ডলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। তিনি যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবেই ঠিকাদার ঘরগুলো নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের এ ঘর নির্মাণের সকল ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজে সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে। তাই এখন তদন্তের ভয়ে ঘরের চালা খুলে দুই ফুট করে উচ্চতা বাড়ানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে মাচপাড়া আশ্রয়ণকেন্দ্রের ৫টি ঘরের চালা ভেঙ্গে ২ফুট উচু করার জন্য চাল খেলা হয়েছে। বুধবার মল্লিকপাড়া, ধুলাউড়ি পূর্বপাড়া, আতাইকুলার পুঠিয়া পাড়া, পাথালিয়াহাট ও জয়রামপুর আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ১০০ ঘরের চালা খুলে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ৩৬০টি ঘরই নুতন করে ২ ফুট উচু করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে কয়েকটি গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ১০০টি ঘরের চালা খুলে ফেলা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। চালাগুলো পাশে রেখে দেওয়া হয়েছে। মাঝগ্রাম ৮ নং ঘরের বাসিন্দা নাজমা খাতুন জানান, ২ ফুট উচ্চতা কম হওয়ায় পুর্ণরায় চাল সরিয়ে উচ্চতা বৃদ্ধি করা হবে। তিনি আরও জানান ঘর নি¤œমানের সামগ্রী দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণের পর সামান্য ছোয়াতেই পলিস্টার উঠে যাচ্ছে। চাল খোলার সময় ঘরের বারান্দার পিলার ভেঙ্গে পড়েছে। ঘরের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য পাশেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে ইট। যা ব্যবহার হবে ঘরের দেওয়ালে। বিনা খাতুন ও খুশি খাতুন নামের আরও দুই বাসিন্দা জানান প্রধানমনাত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ঘর পেয়ে তারা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। এ স্বপ্ন ঘর পাবার আগে কখনও দেখেনি। তবে তারা নি¤œ মানের কাজের জন্য বিপদের মধ্যে রয়েছেন বলে জানান। তাদের দাবি সামান্য বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে পানি পড়ে, ছাগলের দড়িতে টান লাগলে পলেস্তারা উঠে যাচ্ছে। ঘরের বাসিন্দা বিষ্ণুপুরের অজিত কুমার জানান ঘরে পানিতো পড়ছেই এবং ঘরের ওয়াল ফেটে গেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঠিকাদার মোঃ মঈন মন্ডলের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের কথা স্বীকার করে জানান, সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমার পূর্ব পরিচিত। তার অনুরোধে আমি ঘরগুলো নির্মাণ করে দিয়েছি। ইউএনও সাহেব নিজেই ইট, সিমেন্ট, টিন, কাঠসহ যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী কিনে দিয়েছেন। তিনি যেভাবে পরামর্শ দিয়েছেন আমি সেভাবেই ঘরগুলো নির্মাণ করেছি। এলাকায় এতো ঠিকাদার থাকতে কুষ্টিয়ার ঠিকাদারকে দিয়ে ঘর নির্মাণকে রহস্যজনক মনে করছেন সুধিজন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম জামাল আহমেদ জানান, জেলা প্রশাসকসহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ঘর ভেঙ্গে সামান্য উচু করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছোট খাটো কিছু ত্রæটি বিচ্যুতি থাকায় সেগুলো সংশোধনের জন্য মেরামত করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন শনিবার নতুন করে মেরামতের কাজও পরিদর্শনও করেছেন। মোট ৩৭২টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, এর মধ্যে ৩৬০টি ঘর দুই ফুট করে উঁচু করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here