উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীনির্ভর ১৮ লাখ মানুষের জীবনে দুর্দিন

0
3

শফিউল আযম ঃ
শত বছরের বিবর্তণ, জলবাযু পরিবর্তণ, উজানে পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রধান নদ-নদী শাখা-প্রশাখা নদীগুলো মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। এ অঞ্চলের আড়াই হাজার কিলোমিটার নৌপথ এখন রুটি-রুজির পরিবর্তে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ নাব্যতা হারিয়ে নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেচ কার্যক্রম মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়েছে। এক সময় এ অঞ্চলের নদ-নদীতে জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো প্রায় ১৮ লাখ মানুষ বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশের উজানে ভারত ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের সাহায্যে নদীর প্রবাহ আটকে সেচ ক্যানালের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর বিরুপ প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় শতাধিক প্রধান, শাখা ও প্রশাখা নদী নাব্যতা হারিয়ে নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শুস্ক মওসুমে অসংখ্য পানির প্রাকৃতিক উৎস শুকিয়ে গেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে আর্সেনিকের মাত্রা। এ অঞ্চলের যেসব নদ-নদী এক সময় মানুষের বাঁচার অবলম্বন ছিল, তা এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও পণ্যসামগ্রী আনা নেয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। এখন মানুষের যাতায়াত ও পণ্যসামগ্রী আনা নেয়া সড়কপথ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
উত্তরাঞ্চলের এক সময়ের খড়¯্রােতা পদ্মা, মহানন্দা, যমুনা, ব্রক্ষপুত্র, বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, সুতিখালি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, ঝরঝরিয়া, কাকন, মুক্তাহার, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, পূনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ শতাধিক প্রধান নদী, শাখা ও প্রশাখানদীর প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ নাব্যতা হারিয়ে নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, এক সময় উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীতে স্টিমার, লঞ্চ ও বড় বড় মালবাহী নৌকা চলাচল করত। এর বাইরেও নদী পারাপারের জন্য খেয়ানৌকা ছিল। খেয়াঘাটের ইজারাদার এবং মাঝিরা যাত্রী পারাপার করে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতেন। শুধু খেয়ানৌকা নয়, এ অঞ্চলের মানুষ অনেক আগে গয়নার নৌকায় চড়ে দূর-দূরান্তের হাট-বাজারে যাতায়াত করতেন। ভোররাতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে গয়নার নৌকা যাত্রী নিয়ে শহর-বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হতো। আবার সময় অনুযায়ী কোনটা বিকেলে আবার কোনটা রাতে যাত্রী নিয়ে ফিরে যেত গ্রামে। এ অঞ্চলের প্রায় ১৬ লাখ জেলে নদ-নদীতে মাছ ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতেন। তারা এলাকায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় মাছ রফতানি করতেন। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকার মাঝিমাল্লা ও জেলেরা বেকার হয়ে পড়েছেন। নৌকার মাঝিমাল্লা ও জেলেদের মতো বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন স্টিমার ও লঞ্চের সারেং, সুকানি, লস্কর, মাস্টার আর কেরানি। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা অফিস সূত্রে জানা যায়, পদ্মা, যমুনা, ব্রক্ষপুত্র, তিস্তা, বড়াল, হুড়াসাগর, করতোয়াসহ প্রধান প্রধান নদীর বুক চিরে এক সময় লঞ্চ ষ্টিমার চলাচল করতো। গোয়ালন্দ থেকে ভারতের বিহারের পাটনা পর্যন্ত যে স্টিমার চলাচল করত সেটা বাজিতপুর হয়ে যেত। অপর দিকে যমুনা নদী বেয়ে বেড়ার নগরবাড়ী, ভারেঙ্গা, নাকালিয়া, স্থলচর, সিরাজগঞ্জ ও কালীগঞ্জ হয়ে আসাম প্রদেশে চলে যেত। এই সার্ভিস ছিল নিয়মিত। বাজিতপুর ঘাট থেকে পশ্চিম বাংলার দীঘা পর্যন্ত স্টিমার যাতায়াত করত। ঈশ্বরদী সাঁড়াঘাট ও কুষ্টিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী স্টিমার সার্ভিস ছিল নিয়মিত। ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ, ঢাকা-নগড়বাড়ী-রাজশাহী, বেড়া-বড়ালব্রীজ রুটসহ এ অঞ্চলে অসংখ্য রুটে লঞ্চ চলাচল করত। লঞ্চ চলাচল করতে ৯ থেকে ১০ ফুট পানির গভীরতা প্রযোজন হয়। এ অঞ্চলের নদীগুলোতে পানির প্রয়োজনীয় গভীরতা নেই। তাই লঞ্চ চলাচল করতে পারে না। লঞ্চ মালিকেরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। যারা নৌকা চালিয়ে জীবন ধারণ করতেন, তারা অন্য পেশায় গিয়ে সুবিধা করতে পারছেন না। এদিকে উত্তরাঞ্চলে জেলেদের চলছে চরম দুর্দিন। বছরের অধিকাংশ সময় নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয়ে পানি না থাকায় এ পেশার লোকদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। নদী এখন এ অঞ্চলের প্রায় ১৮ লাখ মানুষের রুটি-রুজির মাধ্যমের পরিবর্তে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নদী বিশেষজ্ঞ কামরুন নেছা জানান, গঙ্গা, ব্রক্ষপুত্র ও মেঘনাসহ ৫৪টি আন্তর্জাতিক বা আন্তঃদেশীয় নদী বর্ষা মওসুমে ভাটির বাংলাদেশে পলি বয়ে আনে। গড়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর উজান থেকে সাধারণ বা পরিমিত বৃষ্টিপাতের ফলে পলি আসে প্রায় ১৪০ কোটি টন। প্রকৃতপক্ষে পলি আসার সঠিক বা বিজ্ঞানভিত্তিক কোন উপাত্ত কারো কাছে নেই। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পলি জমার পরিমাণ নিরুপণ করা প্রয়োজন। যদিও ব্যয় বহূল তবু নৌপথের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধান প্রধান নৌপথগুলো নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। তবেই নৌপথগুলো সচল রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের গঙ্গা ব্যারেজ (পরিত্যক্ত) প্রকল্পের সাবেক পিডি মোঃ কবিবুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উজানে অবস্থিত পানির উৎসগুলোর প্রায় সব ক’টিতেই ভারত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মান করে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করছে। এসব নদ-নদীর মূল উৎস প্রধানত হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত। কিছু আছে অন্য পাহাড়ে। এসব মূল নদী ও উপনদীতে বাঁধ দেয়া হয়েছে। এ্র বিরুপ প্রভাবে বাংলাদেশের নদীপথ ও পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের নৌ যোগাযোগ ও সেচ কার্যক্রম মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের অভিন্ন নদীর পানি নিয়ন্ত্রন, অপরিকল্পিত নদী শাসন, উজানে বৃক্ষ নিধন, অতিরিক্ত জমি কর্ষণ, নগরায়ন ও অতিবর্ষণে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে নিরর্ন্ত সেকারণে বর্ষায় অতিরিক্ত পলি আসে। এই পলি সমুদ্রে যাওয়ার কথা থাকলেও উপসাগরীয় ¯্রােত ও জোয়ার তা আবার উজানে ঠেলে দেয়। জোয়ারের সময় পানি শান্ত থাকায় এই পলি জমা হয় নদীতে। পানি নামার সময় ¯্রােতের বেগ তুলনামূলক কম থাকায় পলি কেটে সমূদ্রে নিতে পারে না। এ কারণে নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে দেশের নদীপথ।
বিআইডব্লিউটিএ’র একটি সূত্র জানিয়েছে, নেদারল্যান্ডের বিশেষজ্ঞরা ১৯৮৯ সালের জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথের সবটুকু ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যদি ছয় হাজার কিলোমিটার নদীপথ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু এ নৌপথটুকু টিকিয়ে রাখতে পারেনি কোন সরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here