করোনায় বিদেশে শুঁটকি রফতানি বন্ধ লোকসানের আশঙ্কায় চাতাল মালিকরা

0
70

শফিউল আযম ঃ
পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত মৎস্যভান্ডার খ্যাত চলনবিল। উত্তরাঞ্চলের বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদে সমৃদ্ধ চলনবিল। বিলে উৎপাদিত হয় বিপুল পরিমান মাছ। এবারের দীর্ঘ বণ্যায় চলনবিলে মাছেন উৎপাদন হয়েছে প্রায় দেড়গুণ। দেশি প্রজাতির মাছ ধরা ও শুকানোর এই ভরা মওসুমে চাতাল মালিক ও শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। ফলে এবছর চলনবিলাঞ্চলে শুঁটকি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরাা জানিয়েছেন। এদিকে শুঁটকি উৎপাদন বেশি হওয়া এবং করোনাকালীন সময়ে বিদেশে রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাতাল মালিক ও রফতানিকারকরা লোকসনের আশঙ্কা করছেন।
জানা গেছে, পদ্মা ও যমুনার প্লাবনভূমি চলনবিলের প্রায় ছয় হাজার ০৪৩ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল ও ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ২২টি খাড়িসহ অসংখ্য পুকুর রয়েছে। বণ্যার পানি বড়াল ও হুড়াসাগর নদী হয়ে যমুনা নদীতে নেমে গেলে এসব বিল, নদী ও খাড়ি শুকিয়ে হাজার হাজার হেক্টর সমতল ভূমি জেগে ওঠে। স্থানীয় কৃষকরা জেগে ওঠা জমিতে সরিষা, গাজর, রসসুর, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করছেন। এবারের কয়েক দফা বণ্যায় মাছের উৎপাদন হয়েছে দেড়গুণ।
একটা সময় ছিল যখন চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলত। মাছ বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয় এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেল পথ নির্মিত হয়। তখন চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ওই সময় ট্রেনে করে মাছ যেত কলকাতায়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মান করা হয়। ২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিরে নির্মান করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বনপাড়া-হাটিকুমরুল-যমুনা সেতু সংযোগ সড়ক। চলনবিলে এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বেঁচে আছে মাত্র ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৮৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সারা বছর পানি থাকে।
চলনবিলের প্লাবন ভূমির দেশী মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০০টি অস্থায়ী শুঁটকির চাতাল। গুরুদাসপুরের সাতগাড়ী গ্রামের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন শুঁটকির চাতাল গড়েছেন তারাশের মহিষলুটি এলাকায়। তিনি জানান, গত বছর তার ২টি চাতালে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ মন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। সৈয়দপুর, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ীরা এসে চাতাল থেকেই শুঁটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। তবে এ বছর চলনবিলের প্লাবন ভূমিতে মাছ ধরা পড়ছে বেশি। এরফলে তাড়াশের মহিষলুটির ১০টি চাতালসহ অধিকাংশ শুঁটকি চাতালে পর্যাপ্ত পরিমান তাজা মাছের রয়েছে। তবে ক্রেতার অভাবে বিক্রি হচ্ছে কম। এ অবস্থা চলতে থাকলে লাভ-তো দুরের কথা, চালান উঠানো যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন চাতাল মালিকরা।
পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মওসুমে ৩০০টি চাতালে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। সাড়ে ৫০০ টন শুটকি উৎপাদনে প্রায় এক হাজার ৫০০ মেট্্িরক টন কাঁচা মাছ প্রয়োজন। এদিকে চলতি শুঁটকি মওসুমে চলনবিলের প্লাবন ভূমিতে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত পরিমান মাছ ধরা পড়ছে। ফলে শুটকি উৎপাদনের এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে চাতাল মালিকরা জানিয়েছেন। তারা জানান, মওসুমের শুরুতে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে চাতাল তৈরি করেছেন। মাছের জন্য স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের অগ্রিম টাকা দিতে হয়েছে। তাদের সরবরাহ করা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন, এ সময় বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি চাতাল থেকে পছন্দের শুটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। শুঁটকি মাছ মান ভেদে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের (ভাল মানের) শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াজাত করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। সাধারনত এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে রয়েছে চলনবিলের শুঁটকি মাছের আলাদা কদর।
তাছাড়া ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও চট্রগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে চলনবিলের শুঁটকি মাছ। সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ মিয়া জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের মান ভালো। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলনবিলের মিঠা পানির শুঁটকি মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এ বছর মাছের উৎপাদন বেশি হওয়ায় প্রচুর পরিমান শুঁটকি মাছের মজুত গড়ে উঠেছে। ক্রেতার অভাবে বিক্রি হচ্ছে কম। করোনার প্রকোপে বিদেশে শুটকি মাছ রফতানি বন্ধ হয়ে যাৗয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যসায়ীরা জানিয়েছেন।
চলতি মওসুমে চলনবিলে চাতাল সংখ্যা বেড়ে ২৭০ থেকে প্রায় ৩০০টি হয়েছে। অস্থায়ী চাতালে মাছ শুঁটকি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শুঁটকি তৈরির চাতাল মালিকরা এখানে আস্তানা গেঁড়েছেন। সাধারনত তিন থেকে ছয় লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করা যায়। পানি কমতে থাকালে চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে পুঁটি, নয়না, খলসে, চেলা, টেংরা, কই, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচিবাইম, লওলা, বোয়াল, কাতলসহ নানা জাতের মাছ। এসব মাছ কিনে নিজেরা চাতালে শুকিয়ে উৎপাদন করে শুঁটকি। পরে এই শুঁটকি পাঠানো হয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু এ বছর শুঁটকি মাছের চাহিদা ও বিক্রি কমে যাওয়ায় চাতাল মালিকরা ব্যবসায়ীদের দাদনের টাকা কিভাবে শোধ করবে সেই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জানা যায়, চলনবিলের প্রায় দুই সহ¯্রাধিক পরিবার শুঁটকি তৈরির কাজে জড়িত রয়েছেন। এসব পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা দিন হাজিরায় কাজ করছেন শুঁটকি চাতালে। নারী শ্রমিকরা মজুরী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। কাজের ধরন অনুয়ায়ী একজন পুরুষ শ্রমিক মজুরি পাচ্ছেন ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪৫০ টাকা। একই কাজে নারী শ্রমিকদেও দেয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত ননুয়াকান্দি গ্রামের সবিতা, তাহমিনাসহ বেশ কয়েকজন নারী ও পরুষ শ্রমিক জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি তৈরি করা হয়। প্রকার ভেদে শুঁটকির বাজার মূল্য ৬০০ টাকা থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা।
বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি শুঁটকি মোকামের একাধিক আরতদার জানিয়েছেন, এই মহাসড়ক নির্মানের আগে চলনবিল থেকে আহরিত বিপুল পরিমান মাছ অবিক্রিত থাকতো। এসব মাছ পরে শুঁটকি করা হতো অথবা ফেলে দেয়া হতো। তখন উদ্বৃত মাছ স্বল্প মূল্যে কিনে শুঁটকি তৈরি করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে অনেক চাতাল মালিক আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। আর এখন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছে চলনবিলের তাজা ও শুঁটকি মাছ কিনে ট্রাকে ভরে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন জেলায়। চলনবিলের দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরির চাতালগুলো পৌষ মাস পর্যন্ত চালু থাকে। মাছ রফতানিকারকরা শুঁটকি মাছ কিনে প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছেন। এ বছর বিদেশে রফতানি বন্ধ থাকায় শুটকি মাছের চাহিদা কমে গেছে।
চলনবিলের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর চলনবিল চাহিদামতো কাঁচা মাছ পাওয়া শুঁটকি উৎপাদন অনেক বেড়েছে। চড়া সুদে দাদন নিয়ে শুঁটকির চাতাল মালিকরা জেলে ও ব্যপারিদের অগ্রিম টাকা দিয়েছিলেন। শুঁটকি উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা ও দাম কমে যাওয়ায় এবছর তাদের লোকসানের গুনতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here