পাবনার ৫টি নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন ভাঙনের ঝুঁকিতে ৩০টি গ্রাম ফসলী জমি

0
133

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) থেকে ঃ
পাবনা জেলার পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা, যমুনা, বড়াল, হুড়াসাগর ও সুতিখালি এই ৫টি নদী থেকে ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে আসছে। পাঁচিিট নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে বালু সন্ত্রাসীরা। তারা বোমামেশিন ও স্থানীয়ভাবে তৈরি ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে নদীর তলদেশে থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করছে। এতে নদী পাড়ের গ্রামগুলোর বাসতবাড়ী, ফসলী জমি, তীর সংরক্ষণ কাজ ও পুরাতন বণ্যানিয়ন্ত্রন বাঁধ, রেল ষ্টেশন, পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীডের টাওয়ার ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে। নদী পাড়ের মানুষ প্রতিবাদ করা তো দুরের কথা, বালু সন্ত্রাসীদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। মুখ খুলেই তাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। এদিকে ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে নদী পাড়ের ৩০টি গ্রাম, ঢালারচর রেল ষ্টেশন, পূর্ভ-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীডের টাওয়ার, জামে মসজিদ, কবরস্থান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে নির্মাণাধীন বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ।
যমুনা, পদ্মা, বড়াল ও হুড়াসাগর নদী পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে বালু বেচা-কেনার হাট বসেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বালু কেনা-বেচা হচ্ছে। ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জেল জরিমানাতে থামছে না অবৈধভাবে বালু উত্তেলন। বিনা পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় প্রভাবশালী বালুসন্ত্রাসীরা জেল জরিমানা উপেক্ষা করে নদী থেকে বালু উত্তোলনসহ প্রকাশ্যে বেচা-কেনা অব্যহত রেখেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নদী পাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছে, বালু বিক্রি টাকার ভাগ উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের কিছু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি পাচ্ছেন। সে জন্য চিহিৃত বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যাদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের বনিবনা হচ্ছে না, শুধু মাত্র তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণেই পাবনার ৫টি নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবনার বড়াল নদীতে ফরিদপুর উপজেলার ড়েমরা ঘোষপাড়া, সাঁথিয়ার পাথালিয়া হাট, চিথুলিয়া,সুতিখালি নদীর সোনাতলা, হুড়াসাগর নদের বেড়ার মোহনগঞ্জ, ডাকবাংলা, যমুনা নদীর পেঁচাকোলা, নটাখোলা, হরিরামপুর, কাজীরহাট, খানপুরা, পদ্মা নদীতে ঢালারচর রেল ষ্টেশন, সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ, সাতবাড়ীয়া, বাঠপাড়া, রাইপুর, গোপালচন্দ্রপুর, হাসামপুর, বর্খাপুরসহ ৫টি নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকার শতাধিক পয়েন্টে বোমামেশিন ও স্থানীয়ভাবে তৈরি ড্রেজারের সাহায্যে নদীর তলদেশে থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর ¯্রােতধারা গতিপথ পরিবর্তন করায় গত এক বছরে মোহনগঞ্জ, চরপেঁচাকোলা, চিথুলিয়া, বেনটিয়া, প্রতাপপুর, নটাখোলা, হরিরামপুর, কাজীরহাট, খানপুরা, নাজিরগঞ্জ, সাতবাড়ীয়া, বাঠপাড়া, রাইপুর, গোপালচন্দ্রপুর, হাসামপুর, বর্খাপুরসহ প্রায় ৩০টি গ্রামে নদী ভাঙনে দেড় সহ¯্রাধিক বসতবাড়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দির, দুই হাজার হেক্টর ফসলী জমিসহ, বণ্যা নিয়ন্ত্রর বাঁধের আংশিক নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
সুজানগর উপজেলার হাসামপুর ও বর্খাপুর এলাকায় স্থানীয় সাংসদের লোক পরিচয় দিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রায় ২০-২২টি ড্রেজার মেশিনের সাহয্যে প্রকাশ্যে পদ্মা নদী নদী থেকে বালু উত্তেলন করছে। ওই নাজিরগহ্জে এনে বিশাল বিশাল স্তুপ করে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে নাজিরগঞ্জ বালু ব্যবসার বানিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সেখান থেকে প্রতিদিন ৬০-৭০ ট্রাক বালু বেচাকেনা করা হচ্ছে। বেড়ার নটাখোলায় অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার থেকে যমুনা নদী ১৫০ মিটার দুর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নটাখোলায় বালু উত্তোলনের ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রীডের টাওয়ার ভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজীরহাট ও নটাখোলা এলাকায় এই বালু উত্তোলন সাথে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজীরহাটের ভাটিতে পদ্মার পাড়ে ঢালারচর অবস্থিত। পাবনা থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। ঢালারচরে রেল ষ্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। রেল ষ্টেশনের পাশ থেকে বালু উত্তোলন করায় ষ্টেশনটি ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে। কাজীরহাট থেকে ঢালারচর পর্যন্ত পদ্মা নদীতে বালু উত্তোলনের সাথে ওই চক্রটি বলে অভিযোগ উঠেছে। সাঁথিয়ার সোনাতলায় সাবেক এক মন্ত্রীর আত্মীয় ও দলীয় কিছু নেতা সুতিখালি নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রির জন্য স্তুপ করে রেখেছে। এতে প্রায় ২০০ বিঘা জমি ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সরেজমিন প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে গত এক বছরে চিথুলিয়া, চরপেঁচাকোলা, মোহনগঞ্জ, ঘোপসেলন্দা, নটাখোলা, প্রতাপপুর, কাজীরহাট, ঢালারচর, খানপুরা, নাজিরগঞ্জ, সাতবাড়ীয়া, বাঠপাড়া, রাইপুর, গোপালচন্দ্রপুর, হাসামপুর, বর্খাপুরসহ প্রায় ৩০টি গ্রামের দুই সহ¯্রাধিক বসতবাড়ী, স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, মন্দির, প্রায় দুই হাজার হেক্টর ফসলী জমি, পুরাতন বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের আংশিকসহ অসংখ্য গাছপালা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
এদিকে অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের চরপেঁচাকোলা, চিথুলিয়া, মোহনগঞ্জ থেকে কৈটোলা, নগরবাড়ী, প্রতাপপুর, নটাখোলা, খানপুড়া, কাজীরহাট সুজানগর উপজেলার ১০ পয়েন্টের ভাঙন প্রতিরক্ষা কাজের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এসকল গ্রামের ৩৫ হাজার বসতবাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কয়েক হাজার হেক্টর জমি ভাঙনের হুমকীর মুখে পড়েছে। পেঁচাকোলা-কৈজুরি পুরাতন বণ্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিত প্রায় ১০ হাজার পরিবার ভাঙন আতঙ্কে ভূগছে।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলা থেকে ভাটির বেড়ার ঢালারচর, ঢালারচর থেকে সুজানগর উপজেলার পদ্মা অববাহিকার প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়েই রয়েছে বালু উত্তোলনকারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ওই এলাকাজুড়ে প্রতিদিন ৬০-৭০টি বোমামেশিনের সাহায্যে নদীর তলদেশের ২০-৬০ ফুট গভীর থেকে বালু উত্তোলন করে নৌকায় পাড়ে আনা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার নদী থেকে মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি নদী পাড়ে এনে রাখা হচ্ছে। নদী পাড়ের কাজিরহাট, নটাখোলা, হরিরামপুর, বেড়া ডাকবাংলা ও বৃশালিখায় বালু বেচা-কেনার হাট বসেছে। সবচেয়ে বেশি বালু মজুত করা হচ্ছে সুজানগরের নাজিরগঞ্জে। নাজিরগঞ্জের বালুর ব্যাপব চাহিদা রয়েছে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে। বালু মজুতের বিভিন্ন পয়েন্টে থেকে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক বালু জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষাধিক ঘন ফুট বালু বিক্রি করে সংশ্লিষ্টরা হাতিয়ে নিচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। এদিকে সরকার রাজস্ব বিপুল পরিমান আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরবাড়ী ঘাটের পার্শ্ববর্তী যমুনা নদী থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমান বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সেখানে একাাধিক বোমামেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে বড় বড় নৌকা অথবা কার্গোজাহাজ বোঝাই করে নগরবাড়ীর অদুরে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর পর সেখান থেকে দীর্ঘ পাইপের মাধ্যমে উত্তোলিত বালু এনে রাখা হয় নগরবাড়ী ঘাটের পাশে খোলা জায়গায়। সেখান থেকে ট্রাক বোঝাই করে বালু পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। বালু উত্তোলনে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানভেদে প্রতিট্রাক বালু বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দরে। প্রতিদিন চারশ’ ট্রাক বালু বিক্রি হচ্ছে। বালু বিক্রির টাকা রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে থাকে।
নগরবাড়ী ঘাট নলখোলা বণিক সমিতির সাধারন সম্পাদক ও পুরাণভারেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান এ এম রফিকউল্লাহ ও তার ভাতিজার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। রফিকউল্লাহ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, বালু উত্তোলনের ফলে নগড়বাড়ী ঘাট মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়েছে। যেহেতু বেড়া অংশে যমুনা নদীতে বালু মহল নেই, সে জন্য প্রশাসনের উচিত নদী সার্ভে করে নিরাপদ স্থান থেকে বালু উত্তোলনের আদেশ দেয়া। এতে সরকারের বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হামিদ এ প্রতিনিধিকে বলেন, যমুনা ও পদ্মা নদী ভাঙন প্রতিরক্ষ কাজের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীর যে কোনো পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন প্রতিরক্ষা কাজের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। নদীর যে স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হয় তার চার পাশের এলাকা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে জন্য প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই সম্ভাব্য ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসিফ আনাম সিদ্দিকী বলেছেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছিলাম। যদি আবার তারা বালু উত্তোলন শুরু করে থাকে তবে দ্রæততম সময়ে তা বন্ধ করতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here